ইসলামি জীবনদর্শনে কিছু নির্দিষ্ট সময় ও রজনি রয়েছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; বরং মানুষের আত্মিক জীবন ও নৈতিক গতিপথে গভীর প্রভাব ফেলে। শাবান মাসের পনেরোতম রাত—যা ‘শবেবরাত’ নামে পরিচিত—তেমনই এক তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থবহ রজনি। এটি রহমত ও ক্ষমার বার্তা বহন করে, একই সঙ্গে আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি ও তাকদিরের দুয়ারে করুণা প্রার্থনার এক গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

‘শবেবরাত’-এর ‘বরাত’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘বারাআহ’ ধাতু থেকে, যার অর্থ মুক্তি, নিষ্কৃতি বা দায়মুক্তি। এই অর্থে শবেবরাত হলো গুনাহ থেকে মুক্তি, জাহান্নামের শাস্তি থেকে অব্যাহতি এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের সম্ভাবনাময় রাত। ইসলামের মনীষীরা যুগে যুগে এই রজনিকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের আত্মিক সংস্কারের এক মোক্ষম সময় হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন।
যদিও পবিত্র কোরআনে সরাসরি ‘শবেবরাত’ শব্দটি উল্লেখ নেই, তবে সুরা আদ-দুখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,
“নিশ্চয়ই আমি তা নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। সে রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হয়।” (সুরা আদ-দুখান: ৩–৪)
এই ‘বরকতময় রাত’ কোনটি—তা নিয়ে তাফসিরবিদদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও বহু প্রখ্যাত তাবেয়ি ও মুফাসসির শাবানের মধ্যরাতের সঙ্গে এর সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেছেন। মতভেদের বিশ্লেষণ যাই হোক, শবেবরাত যে একটি বরকতপূর্ণ ও তাৎপর্যবাহী রজনি—এ বিষয়ে দ্বিমত নেই। উপরন্তু, হাদিসে শবেবরাতের ফজিলত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন,
“আল্লাহ তাআলা শাবানের মধ্যরাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন।”
(সহিহ ইবনে হিব্বান, বায়হাকি)
হাদিসবিশারদদের গবেষণায় এই বর্ণনাকে সহিহ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইমাম হাফেজ নূরুদ্দীন হায়সামী (রহ.) উল্লেখ করেন, এর বর্ণনাকারীরা সবাই নির্ভরযোগ্য। (মাজমাউয যাওয়াইদ)
আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী (রহ.) বলেন, বিভিন্ন সনদে সাহাবায়ে কেরামের একটি বড় অংশ এই হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা পরস্পরকে শক্তিশালী করে।
এই হাদিসগুলো বর্ণনা করেছেন মুআয ইবনে জাবাল, আবু সালাবা আল খুশানি, আবদুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আশআরি, আবু হুরায়রা, আবু বকর (রা.), আউফ ইবনে মালেক ও আয়েশা (রা.) প্রমুখ। আলবানী (রহ.) স্পষ্ট করে বলেন, শবেবরাত সম্পর্কিত হাদিসগুলো সামগ্রিকভাবে নিঃসন্দেহে সহিহ। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহিহ)
এই হাদিসগুলো শবেবরাতের মূল দর্শন স্পষ্ট করে দেয়—এ রাত শুধু ইবাদতের নয়, বরং হৃদয়ের পরিশুদ্ধতার রাত। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার ও সম্পর্কচ্ছেদের মতো আত্মিক ব্যাধি আল্লাহর ক্ষমা লাভের পথে বড় অন্তরায়। তাই শবেবরাত মানুষকে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক সংশোধনের আহ্বান জানায়।
অনেক আলেমের মতে, এই রাতে আগামী এক বছরের জন্য জীবন-মৃত্যু, রিজিক ও নানা বিষয়ের সিদ্ধান্ত ফেরেশতাদের কাছে অর্পণ করা হয়। যদিও চূড়ান্ত তাকদির আল্লাহর জ্ঞানেই নির্ধারিত, তবু দোয়া, তওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর রহমত আকর্ষণ করতে পারে—এটাই ইসলামের আশাবাদী শিক্ষা।
শবেবরাতের মূল আমল হলো নফল ইবাদত, দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত এবং কান্নাভেজা মোনাজাতে লিপ্ত থাকা। এই রাতে জেগে ইবাদত করা এবং পরদিন নফল রোজা রাখা ফজিলতপূর্ণ আমল হিসেবে বিবেচিত। তবে শবেবরাতকে কেন্দ্র করে শরিয়তসম্মত আমল ও লোকাচারভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রাখা জরুরি।
আতশবাজি, আলোকসজ্জা, উচ্চ শব্দে আনন্দ প্রকাশ কিংবা নির্দিষ্ট নিয়মে বাধ্যতামূলক নামাজ আদায়ের মতো বিষয়গুলোর কোনো ভিত্তি কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেই। বরং এসব কাজ এই রাতের নীরবতা, ভাবগাম্ভীর্য ও আত্মিক আবহকে ব্যাহত করে।
শবেবরাত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম কোনো আনুষ্ঠানিকতার ধর্ম নয়; এটি অন্তরের পরিবর্তনের ধর্ম। এই রাত মানুষকে নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়—আমি কেমন মানুষ? আমার উপার্জন কতটা হালাল? আমার সম্পর্কগুলো কতটা ন্যায়ভিত্তিক? আমার ইবাদত কি নিছক অভ্যাস, নাকি আল্লাহপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ?
সবশেষে বলা যায়, শবেবরাত কোনো উৎসবের রাত নয়; এটি নীরব আত্মসংস্কারের রাত। গুনাহের অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরে আসার রাত। তাকদিরের দরজায় করুণা প্রার্থনার রাত। যদি এই রাতে মানুষ আন্তরিকভাবে আত্মশুদ্ধির পথে এক কদমও এগোয়, তবে শবেবরাত তার জীবনে প্রকৃত মুক্তির সূচনা হয়ে উঠতে পারে।
লেখক : মুফতি রফিকুল ইসলাম আল মাদানি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


