ইসলামের ইতিহাসে রসুলে আকরাম হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো মেরাজ। নবুয়তের দ্বাদশ বর্ষে, তাঁর বয়স যখন ৫২ বছর, তখন ২৭ রজবের পবিত্র রজনিতে (২৬ তারিখ দিবাগত রাতে) এই অলৌকিক ঘটনা সংঘটিত হয়। এ রাতেই আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় বান্দাকে নিজের সান্নিধ্যে ডেকে নেন। এই মহিমান্বিত স্মৃতিকে ঘিরেই মুসলিম উম্মাহ প্রতি বছর গভীর ভক্তি ও ভালোবাসার সঙ্গে লাইলাতুল মেরাজ পালন করে।

মেরাজের অর্থ ও তাৎপর্য
‘মেরাজ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ ঊর্ধ্বে আরোহণ, সিঁড়ি, পথ কিংবা আসমানি সফর। ইসলামি পরিভাষায়, মেরাজ বলতে বোঝায়—রসুল (সা.)-এর বোরাক নামক বিশেষ বাহনে মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা গমন, এরপর একে একে সাত আসমান অতিক্রম করে সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছানো এবং সেখান থেকে রফরফ বাহনে আরশে আজিমে মহান আল্লাহর দিদার ও কথোপকথন লাভ করা। এই সফরের মধ্যেই তিনি জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন এবং উম্মতের জন্য সালাতের বিধান নিয়ে পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তন করেন—এই সমগ্র ঘটনাই মেরাজ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাত্রিকালে ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশ আমি বরকতময় করেছি—যাতে আমি তাকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাই। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’
(সুরা বনি ইসরাইল : ১)
দুঃখের পর প্রশান্তির বার্তা
মেরাজ সংঘটিত হওয়ার আগের সময়টি ছিল রসুল (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায়। একই বছরে তাঁর অভিভাবক চাচা হজরত আবু তালেব (রা.) এবং সহধর্মিণী হজরত খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। এই বছর ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল হুজুন’ বা শোকের বছর নামে পরিচিত। তাঁদের ইন্তেকালের পর কাফেরদের নির্যাতন আরও বেড়ে যায়। মক্কায় দাওয়াতের পথ সংকুচিত হয়ে পড়লে তিনি তায়েফে যান, কিন্তু সেখানেও অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হন।
এই গভীর বেদনা ও কষ্টের মুহূর্তে আল্লাহতায়ালা তাঁর প্রিয় হাবিবকে মেরাজের মাধ্যমে নিজের সান্নিধ্যে এনে হৃদয়ের প্রশান্তি দান করেন। মেরাজ তাই শুধু অলৌকিক সফর নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও সান্ত্বনার এক মহান নিদর্শন।
আল্লাহ ও রসুল (সা.)-এর অতুলনীয় সান্নিধ্য
মেরাজের রাতে আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.)-এর মধ্যে এমন নৈকট্য সৃষ্টি হয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা দুরূহ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে—
‘তখন তাদের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রইল, বরং তার চেয়েও কম। অতঃপর আল্লাহ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহি করার তা ওহি করলেন।’
(সুরা আন-নাজম : ৯–১০)
হাদিসে বর্ণিত আছে, আসমানি সফরের সময় মহান আল্লাহ রসুল (সা.)-এর এতটাই নিকটবর্তী হন, যেমন তির ও ধনুক পরস্পরের কাছাকাছি থাকে—বরং তার চেয়েও নিকট। (তাফসিরে দুররে মানছুর)
ইমামুল মুরসালিন হিসেবে স্বীকৃতি
মেরাজের এক গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রসুল (সা.)-এর ইমামুল মুরসালিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা। তিনি যখন মসজিদুল আকসায় পৌঁছান, তখন পূর্ববর্তী সব নবী-রসুল সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা সবাই সম্মানের সঙ্গে তাঁকে সালাম জানান এবং আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ইমামতিতে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। এর মাধ্যমেই রসুল (সা.) সব নবীর ইমাম হিসেবে স্বীকৃত হন।
এরপর আসমান সফরের সময় তিনি হজরত আদম (আ.), হজরত ঈসা (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত ইদ্রিস (আ.) ও হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। (সহিহ বুখারি)
নামাজ: মুমিনের মেরাজ
মেরাজের সবচেয়ে বড় উপহার হলো—পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ। এই বিধানের মাধ্যমে উম্মতে মোহাম্মদির জন্য আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপনের পথ উন্মুক্ত হয়েছে। রসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন,
‘নামাজ হলো মুমিনের জন্য মেরাজ।’
(তাফসিরে মাজহারি)
অর্থাৎ, যেমন রসুল (সা.) মেরাজের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন, তেমনি একজন মুমিন নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে।
লেখক : ড. মুহাম্মদ নাছিরউদ্দীন সোহেল
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


