ঈমান হলো মানবজীবনের সর্বোচ্চ ও অমূল্য সম্পদ। দুনিয়ার যাবতীয় ধন-সম্পদ, ক্ষমতা ও সম্মান এক পাল্লায় আর ঈমান অন্য পাল্লায় রাখলে—নিঃসন্দেহে ঈমানই ভারী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ঈমান ছাড়া মানুষের সব আমল মূল্যহীন, সব অর্জন অর্থহীন। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয়, মর্যাদা এবং আখিরাতের মুক্তির একমাত্র মূলধন হলো ঈমান।

তবে এই ঈমান অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কখনো তা দৃঢ় হয়, আবার কখনো দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই ইসলাম শুধু ঈমান গ্রহণের নির্দেশ দেয়নি; বরং ঈমান রক্ষা, সংরক্ষণ ও সুদৃঢ় করার জন্য সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনাও দিয়েছে।
বর্তমান যুগে শিরক, কুফর, বিদআত, নাস্তিকতা, ভোগবাদ, নৈতিক অবক্ষয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তির যে প্রবল স্রোত বইছে—তাতে ঈমান টিকিয়ে রাখা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। এই বাস্তবতায় ইসলামের নির্দেশনাগুলো জানা ও জীবনে বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
বিশুদ্ধ আকিদা—ঈমান রক্ষার প্রথম ভিত্তি
ঈমানের মূলভিত্তি হলো সঠিক ও বিশুদ্ধ আকিদা। আকিদা শুদ্ধ না হলে কোনো আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন,
‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন।’
(সুরা মায়িদা : ৭২)
ইসলাম তাওহিদকে ঈমানের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে নির্ধারণ করেছে। আল্লাহর সত্তা, গুণাবলি, ইবাদত ও কর্তৃত্বে কাউকে শরিক না করাই ঈমানের মূল কথা। কবরপূজা, তাবিজ-কবচে আস্থা, জ্যোতিষবিদ্যা, ভাগ্য গণনায় বিশ্বাস—এসব বিষয় ঈমান ধ্বংসকারী কিংবা মারাত্মকভাবে দুর্বলকারী। তাই ঈমান রক্ষার প্রথম শর্ত হলো শিরক থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং সহিহ আকিদা শিক্ষা ও ধারণ করা।
কোরআন ও সুন্নাহর সঙ্গে গভীর সংযোগ
কোরআন হলো ঈমানের প্রাণশক্তি, আর সুন্নাহ হলো সেই ঈমানের বাস্তব ও জীবন্ত রূপ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ নির্দেশ করে, যা সর্বাধিক সঠিক।’
(সুরা ইসরা : ৯)
যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করে, অর্থ বুঝে পাঠ করে, চিন্তা-গবেষণা করে এবং জীবনে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে—তার ঈমান ক্রমশ শক্তিশালী হয়। একইভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ ঈমানের জন্য শক্ত ঢালস্বরূপ। বিদআত ও মনগড়া আমল থেকে দূরে থাকাও ঈমান সুরক্ষার অন্যতম উপায়।
ফরজ ইবাদতে যত্নবান হওয়া
ইবাদত ঈমানকে মজবুত করে, আর গুনাহ ঈমানকে দুর্বল করে দেয়। নামাজ, রোজা, জাকাত ও হজ—এই ফরজ ইবাদতগুলো ঈমানের প্রহরীর মতো কাজ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘বান্দা ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ।’
(সহিহ মুসলিম)
নামাজ ত্যাগ করলে ঈমান চরম ঝুঁকির মুখে পড়ে। নিয়মিত নামাজ, বিশেষত জামাতে নামাজ ঈমানকে জীবন্ত ও সক্রিয় রাখে। রোজা আত্মসংযম গড়ে তোলে, জাকাত সম্পদের মোহ ভাঙে, আর হজ তাওহিদের বাস্তব প্রশিক্ষণ দেয়। সব মিলিয়ে ফরজ ইবাদত ঈমান রক্ষার অপরিহার্য উপাদান।
গুনাহ থেকে দূরে থাকা
গুনাহ হলো ঈমানের জন্য বিষতুল্য। ছোট গুনাহ জমে বড় গুনাহে রূপ নেয়, আর বড় গুনাহ ঈমানকে নিভিয়ে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘মুমিন যখন গুনাহ করে, তার অন্তরে একটি কালো দাগ পড়ে।’
(তিরমিজি)
চোখের গুনাহ, জিহ্বার অপব্যবহার, হারাম উপার্জন, সুদ, ঘুষ, ব্যভিচার, মিথ্যাচার—এসবই ঈমান ধ্বংসের পথে ধাবিত করে। তাই ইসলাম কঠোরভাবে হারাম থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়েছে।
তাওবা ও ইস্তিগফারের গুরুত্ব
মানুষ হিসেবে ভুল হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু গুনাহের পর তাওবা না করা ভয়ংকর পরিণতির কারণ হতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তাওবা করো।’
(সুরা নুর : ৩১)
নিয়মিত ইস্তিগফার ঈমানকে পরিশুদ্ধ করে, হৃদয়কে নরম করে এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করে। তাওবা ঈমানের নতুন প্রাণসঞ্চার ঘটায়।
সৎ সঙ্গ বেছে নেওয়া
মানুষ তার সঙ্গীর দ্বিন ও চরিত্র দ্বারা প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘তোমাদের প্রত্যেকের উচিত খেয়াল রাখা—সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে।’
(আবু দাউদ)
দ্বিনদার, তাকওয়াবান, আলেম ও সৎ মানুষের সঙ্গ ঈমান বৃদ্ধি করে। আর গুনাহগার, নাস্তিক ও ভ্রান্ত চিন্তার লোকদের সঙ্গ ঈমান ধ্বংস করে দেয়। তাই ঈমান রক্ষায় সৎ সঙ্গ বেছে নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দুনিয়াপ্রীতি ও ভোগবাদ থেকে সতর্কতা
অতিরিক্ত দুনিয়ামুখী মনোভাব ঈমানের বড় শত্রু। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘দুনিয়ার জীবন তো ধোঁকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’
(সুরা হাদিদ : ২০)
ইসলাম দুনিয়া পরিত্যাগ করতে বলেনি, বরং দুনিয়াকে অন্তরে স্থান দিতে নিষেধ করেছে। সম্পদ, পদমর্যাদা ও খ্যাতি যদি হৃদয়ে আধিপত্য বিস্তার করে—তবে ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে।
ইলম অর্জন ও অজ্ঞতা দূর করা
অজ্ঞতা ঈমানের অন্যতম শত্রু। সহিহ জ্ঞান ছাড়া মানুষ সহজেই শিরক, বিদআত ও বিভ্রান্তিতে পতিত হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
‘ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’
(ইবনে মাজাহ)
কোরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বিশুদ্ধ জ্ঞান ঈমানের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।
আল্লাহর ওপর ভরসা ও দোয়ার শক্তি
তাওয়াক্কুল ঈমানের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর দোয়া হলো মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’
(সুরা গাফির : ৬০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত দোয়া করতেন,
‘হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বিনের ওপর স্থির রাখ।’
(তিরমিজি)
ঈমানের নিরাপত্তা
ঈমান একবার অর্জন করলেই চিরতরে নিরাপদ—এমন নয়। সারা জীবন ঈমানকে পাহারা দিতে হয়। ইসলামের সব নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্যই হলো ঈমান রক্ষা করা। বিশুদ্ধ আকিদা, ইবাদতে যত্ন, গুনাহ বর্জন, তাওবা, ইলম অর্জন, সৎ সঙ্গ ও আল্লাহর স্মরণ—এই সবকিছুর সমন্বয়েই ঈমান সুরক্ষিত থাকে।
ফিতনাপূর্ণ এই যুগে ঈমান রক্ষা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা, সচেতনতা এবং আল্লাহর সাহায্যের প্রতি দৃঢ় আস্থা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে ঈমানের সঙ্গে জীবন ও ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু দান করুন। আমিন।
লেখক : মুফতি উবায়দুল হক খান
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


