আন্তর্জাতিক ডেস্ক : আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের কুন্দুজের একটি গলিতে খেলা করছিল চার বছরের ছোট্ট শিশু নিলোফার আয়ুব। হঠাৎ একটা থাপ্পড়ের ধাক্কায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। একজন বিশালদেহী দাঁড়িওয়ালা ব্যক্তি তাকে অশালীনভাবে স্পর্শ করেন। সেই ব্যক্তি নিলোফারকে ধমক দিয়ে বলেন, বোরখা না পরলে ভুগতে হবে তার বাবাকে।

নিলোফার আয়ুব

Advertisement

সেই ঘটনার ২৩ বছর পার হয়ে গেছে। নিলোফার এখন একজন আইনজীবী, লড়াই করেন নারীদের অধিকারের জন্য। নিজের সেই অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন বিবিসির রেডিও অনুষ্ঠান “আউটলুক”-এ।

সাক্ষাৎকারে নিলোফার আয়ুব বলেন, “সেদিন কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি পৌঁছেছিলাম। বাবার মুখটা রাগে লাল হয়ে গেছিল। রাগে তার পুরো শরীর কাঁপছিল। আমার মনে আছে, বাবা রেগে গোটা ঘরে পায়চারি করছিলেন। তিনি বিড়বিড় করে বলছিলেন- ওর সাহস কী করে হল তোমাকে ছোঁয়ার। এরপর একটা বড় সিদ্ধান্ত নেন। উনি মাকে কাঁচি আনতে বলেন আর তারপর আমার চুল কেটে ফেলেন। তারপর মাকে বলেন আমাকে ছেলেদের জামা পরাতে।”

আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের প্রথম পর্যায় নিলোফার বড় হয়েছেন। তালেবানদের শরীয়া আইন থেকে বাঁচতে নিজের জীবনের দশটা বছর তিনি ছেলে সেজে কাটিয়েছেন।

নিলোফার আয়ুব বর্তমানে পোল্যান্ডে বসবাস করেন। ছেলেবেলার ঘটনা মনে করে তিনি বলেন, “সেই দিনগুলোতে আফগানিস্তানে বড় হওয়ার মানে ছিল বিশ্বের সবচেয়ে রক্ষণশীল অঞ্চলে বেড়ে ওঠা। এখানে, অধিকার নির্ধারণ করা হয় আপনি পুরুষ বা নারী কি-না তার বিচারে।”

নিলোফারের জন্ম ১৯৯৬ সালে, যদিও তার পাসপোর্টে লেখা রয়েছে, ১৯৯৩। মার্কিন সেনা ২০০১ সালে আফগানিস্তানে আসার পর তালেবানরা পিছু হটতেই, নিলোফারের বাবা তাকে স্কুলে ভর্তির চেষ্টা ‍শুরু করেন। তিনি চাইছিলেন, মেয়ে যত দ্রুত সম্ভব স্কুলে ভর্তি হোক।

নিলোফারের ভাষ্য, তাদের শহর কুন্দুজ নারীদের জন্য থাকা সহজ ছিল না। নারী তো ছেড়ে দিন, পুরুষদের পক্ষেও এই শহরে থাকা কঠিন ছিল।

তিনি বলেন, “আফগানিস্তানে ছেলে হওয়াটা আপনা থেকেই একটা শক্তি জোগায়। আপনার বয়স যদি দুই হয় তাহলে আপনি সেই মায়ের চাইতে বেশি সম্মান পাবেন যিনি আপনার জন্ম দিয়েছেন। আর বয়স চার হলে তো জন্মদাত্রী মায়ের অভিভাবক হয়ে ওঠে ছেলেরা। তার (মায়ের) অবস্থা হয় দাসীর মতো। একজন নারী হিসেবে আপনি কোথাও স্থান নেই; একেবারে অদৃশ্যই।”

এই কারণে পরিবারের মেয়েদেরকে ছেলেদের মতো পোশাক পরানোর বিষয়টা সাধারণ ঘটনা হয়ে ওঠে বলে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।

যদি কোনো পরিবারে সামনে দাঁড় করানোর মতো পুরুষ না থাকে, তাহলে যেকোনো সম্পদশালী ব্যক্তিই সেখানকার নারী সদস্যের কাছাকাছি পৌঁছে তাকে নিজের স্ত্রী বানানোর চেষ্টা করবে।

নিলোফার বলেন, “আমার ক্ষেত্রে বিষয়টা অন্যরকম ছিল। পরিবারে পুরুষ সদস্য থাকায়, আমরা স্বাধীনভাবে থাকতে পেরেছিলাম।”

অদ্ভুতভাবে চুল কাটা আর ভাইয়ের জামা পরে যে নিলোফারের জীবনটাই পুরো বদলে যেতে চলেছে, সেটা বোধহয় তিনি আন্দাজ করেননি।

নিলোফার বলেন, “আমার ভাইদের সঙ্গে যেমনটা করা হত, আমিও ঠিক সেই রকম ব্যবহারই পেতাম। আমি ছেলেদের পোশাক পরে বাবার সঙ্গে বাজারে যেতে পারতাম, বাসে চেপে ঘুরে বেরাতে পারতাম। আশপাশের ছেলেরা আমার বন্ধু হয়ে গেছিল। আমি সারাটা দিন বাড়ির বাইরে খেলতাম।”

তার বাকী বোনদের পরিস্থিতি কিন্তু আফগানিস্তানের অন্য নারীদের মতোই ছিল। মাথা ঢেকে তাদের বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যেই থাকতে হত। পোশাক দিয়ে আপাদমস্তক ঢেকে রাখতে হত নিজেদের যাতে শরীরের কোনো অংশ দেখা না যায়। যদিও নিলোফারের বাবা এই বিষয়টিকে মানতে পারতেন না।

নিলোফার আয়ুব বলেন, “প্রথাগত হলুদ রঙের জামা পরার পক্ষে আমার বাবা একেবারেই ছিলেন না। কেন আমাদের সঠিকভাবে পোশাক পরানো হয় না, সে বিষয়ে বাবা প্রায়শই মায়ের সঙ্গে ঝগড়াও করতেন। বলতেন কেন আমাদের ঢিলেঢালা, বৃহদাকার জামা পরানো হয়।”

একজন কিশোর হিসেবে বেড়ে ওঠাটা নিলোফারের জীবনকে বিদ্রোহে ভরিয়ে দিয়েছিল। এই কারণেই মেয়েদের শরীরের পরিবর্তনগুলো বুঝিয়ে বলার জন্য একটি “গ্রুপ” তৈরি করেন।

এই মনোভাবই তাকে ভারতে গিয়ে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। বিয়ে সম্পর্কে ধারণাগুলি গঠনের ক্ষেত্রেও এটা সাহায্য করেছিল।

তিনি বলেন, “আমি অনেক বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছি। যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই বিয়ের প্রস্তাব আসতে শুরু করেছিল। কিন্তু বাবা এ বিষয়ে আমায় নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলে দিয়েছিলেন, ও) এখনই বিয়ে করতে যাচ্ছে না। আগে পড়াশোনা শেষ করবে তারপর ও ঠিক করবে কি হবে।”

শেষপর্যন্ত ২০১৬ সালে বিয়ে করেন তিনি। নিলোফারের বাবার মৃত্যুর পর যে শূন্যস্থানটা তৈরি হয়েছিল, সেটা তার স্বামী পূরণ করেন।

নিলোফার বলেন, “অবশ্যই বাবার জায়গাটা নেওয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু উনি (নিলোফারের স্বামী) সেই ভূমিকা পালন করেছেন। উনি খুবই সাহায্য করেছেন আমায়।”

বেরিয়ে আসার রাস্তা

নিলোফার আয়ুবের পরিবার শেষ পর্যন্ত প্রথা ভেঙে বেরিয়ে আসে। মার্কিনদের আধিপত্যে তালেবানদের দাপট কমে গেলে তারা রাজধানী কাবুলে পৌঁছে একাধিক আসবাবপত্রের দোকান খোলেন। একসময় ৩০০ জন কর্মচারী তার দোকাগুলোতে কাজ করত, তাদের অধিকাংশই ছিলেন এমন নারী যাদের কোনো পুরুষ অভিভাবক ছিল না।

কিন্তু ২০২১ এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর তালেবানরা আবার ফিরে আসে। আর তাতেই ফের গা ঢাকা দিতে হয় নিলোফার ও তার পরিবারের সদস্যদের। পরিবার চলে যায় প্রত্যন্ত একটি গ্রামে আর নিলোফার একজন সাংবাদিকের সহযোগিতায় চলে আসেন পোল্যান্ডে।

একটা নতুন জীবন

আফগানিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিমানে ওঠার আগে তিনি পোল্যান্ড সম্পর্কে খুব কমই জানতেন তিনি।

কিন্তু সমস্ত বাধার সম্মুখীন হয়েও তিনি আজ একজন এমন আইনজীবী যিনি নিজের দেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা নারীদের অধিকারের জন্য লড়াই করেন। ইতিমধ্যে ব্রাসেলস, জার্মানি ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন নিলোফার। সেখানকার মানুষকে তার জীবনের কথাও বলেছেন।

ঘর থেকে মুহুর্তের মধ্যে দূর করুন সব ধরণের পোকামাকড়

নিলোফার বলেন, “আমার জীবন ছিল অভিশাপের পাশাপাশি আশীর্বাদও। অভিশাপ কারণ এটি আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। আমি পুরোপুরি নারী বা পুরুষ হতে পারি না। তবে এটিও একটি আশীর্বাদ বলেই প্রমাণ হয়েছিল। আমি দুটো অভিজ্ঞতাই পেয়েছি। আজ আমি একজন শক্তিশালী নারীতে পরিণত করেছে আমায়। আজ আমি সেই শক্তিশালী নারীই।”

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.