হাসি-কান্না মানুষের জীবনেরই অংশ। হাসির মাধ্যমে মানুষ যেমন আনন্দ ও খুশি প্রকাশ করে, তেমনি কান্নায় প্রকাশ পায় তার দুঃখ-বেদনা। কিন্তু মুমিন শুধু পার্থিব প্রত্যাশাপ্রাপ্তির জন্য হাসে না বা কাঁদে না। তার হাসি ও কান্নায় মানবিক অভিব্যক্তির চেয়ে বেশি কিছু থাকে, বিশেষত মুমিনের কান্না তার অনুতাপ, আল্লাহপ্রেম ও আত্মনিবেদনের স্মারক।

হাসি-কান্নার স্রষ্টা আল্লাহ
হাসি ও কান্না আল্লাহর সৃষ্টি ও দান। এর মাধ্যমে আল্লাহ বান্দাকে মনের তীব্র আকুতি ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের সুযোগ করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর নিশ্চয়ই তিনিই হাসান এবং তিনিই কাঁদান।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৪৩)
মুমিন কাঁদে বেশি
ইসলাম হাসি ও কান্নার মতো মানবিক অভিব্যক্তিকে সমানভাবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু পৃথিবী যেহেতু মুমিনের চূড়ান্ত আবাস নয়, এই ক্ষণস্থায়ী জীবন যেহেতু ভুলত্রুটিতে আবর্তিত এবং এই পৃথিবীতে সে পরম আল্লাহর সাক্ষাৎ থেকে বঞ্চিত, তাই মুমিন পৃথিবীতে বেশি কাঁদে এবং কম হাসে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা যেন কম হাসে এবং বেশি কাঁদে।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৮২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানুষ! তোমরা কান্না কোরো, যদি কান্না না আসে তবে কান্নার ভান কোরো। কেননা জাহান্নামিরা জাহান্নামে কান্না করবে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪৩২৪)
আল-কোরআনে কান্না
পবিত্র কোরআনের চারটি সুরার ১০টি আয়াতে কান্নার বর্ণনা এসেছে। এর মধ্যে সুরা মারিয়ামে সর্বোচ্চ পাঁচ আয়াতে, সুরা তাওবা ও বনি ইসরাঈলে দুটি করে আয়াতে এবং সুরা ইউসুফে একটি আয়াতে কান্নার আলোচনা করা হয়েছে। অন্যদিকে আল্লাহর ভয়ে কান্নার বর্ণনা এসেছে ছয়টি আয়াতে, মিথ্যা কান্নার বর্ণনা এসেছে একটিতে এবং উদাসীন হাসির পরিণামে কান্নার বর্ণনা এসেছে একটি আয়াতে।
কোরআনের বর্ণনায় মুমিনের কান্না
পবিত্র কোরআনে মুমিন বান্দার কান্নার কিছু কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। যার কয়েকটি হলো-
১. কোরআন শুনে কান্না করা : মুমিন পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের সময় কান্না করে। আর এটা নবী-রাসুলদের বিশেষ বৈশিষ্ট্যও ছিল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এরাই তারা, নবীদের মধ্যে যাদের আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, আদমের বংশ থেকে এবং যাদের আমি নুহের সঙ্গে নৌকায় আরোহণ করিয়েছিলাম এবং ইবরাহিম ও ইসমাঈলের বংশোদ্ভূত ও যাদেরকে আমি পথনির্দেশ করেছিলাম এবং মনোনীত করেছিলাম; তাদের কাছে দায়ময়ের আয়াত তিলাওয়াত করা হলে তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ত কান্না করতে করতে।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ৫৮)
২. সত্যের সন্ধান পাওয়ার আনন্দে : মুমিন যখন সত্যের সন্ধান পায় তখন সে আবেগে আপ্লুত হয়ে কান্না করতে থাকে। ইরশাদ হয়েছে, ‘রাসুলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন তারা শ্রবণ করে তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে তার জন্য তুমি তাদের চোখ অশ্রু বিগলিত দেখবে। তারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং তুমি আমাদের সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত কোরো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮৩)
৩. কল্যাণ লাভে ব্যর্থ হলে : মুমিন জীবনের সর্বত্র কল্যাণপ্রত্যাশী। যখন কোনো কল্যাণ ছুটে যায়, তখন মুমিন ব্যথিত হয় এবং কান্না করে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদেরও কোনো অপরাধ নেই, যারা তোমার কাছে বাহনের জন্য এলে তুমি বলেছিলে, তোমাদের জন্য কোনো বাহন আমি পাচ্ছি না। তারা অর্থব্যয়ে অসামর্থ্যজনিত দুঃখে অশ্রুবিগলিত চোখে ফিরে গেল।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৯২)
৪. দুঃখ ও বেদনার সময় : দুঃখ-বেদনার ভারে ভারাক্রান্ত হয়েও মুমিন কান্না করতে পারে। এতে কোনো দোষ নেই, যদি না এই কান্নায় আল্লাহর প্রতি অভিযোগ ও দোষারোপ থাকে। বেদনার সময় কান্না একটি মানবিক বিষয়। পবিত্র কোরআনে ইয়াকুব (আ.) সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সে তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং বলল, আফসোস! ইউসুফের জন্য। শোকে তার চক্ষুদ্বয় সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং সে ছিল অসহনীয় মনস্তাপে ক্লিষ্ট।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৮৪)
৫. আক্ষেপ ও অনুতাপের কান্না : মুমিন বান্দার জন্য যখন কোনো ভুল হয়, তখন সে আক্ষেপ ও অনুতাপে আল্লাহর দরবারে কান্না করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা পেছনে রয়ে গেল তারা আল্লাহর রাসুলের বিরুদ্ধাচরণ করে বসে থাকতেই আনন্দ বোধ করল এবং তাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করা অপছন্দ করল এবং তারা বলল, গরমের মধ্যে অভিযানে বের হয়ো না। বোলো, উত্তাপে জাহান্নামের আগুন প্রচণ্ডতম, যদি তারা বুঝত। অতএব, তারা কিঞ্চিৎ হেসে নিক, তারা প্রচুর কাঁদবে, তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ।’
(সুরা : তাওবা, আয়াত : ৮১-৮২)
যে কান্না নিষিদ্ধ
বান্দার চোখের পানি আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। কিন্তু কখনো কখনো কান্না আল্লাহ থেকে বান্দাকে দূরে সরিয়ে দেয়; যখন সে কান্না হয় মিথ্যা ও প্রতারণামূলক। নবী ইউসুফ (আ.)-এর ভাইয়েরা যেভাবে কেঁদেছিল। ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা রাতের প্রথম ভাগে কাঁদতে কাঁদতে তাদের পিতার কাছে এলো…তারা তার জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে এনেছিল। সে বলল, না, তোমাদের মন তোমাদের জন্য একটি কাহিনি সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ১৬ ও ১৮)
চোখে পানি না থাকা নিন্দনীয়
মুমিনের চোখের পানি তার ঈমানি জীবনের সৌন্দর্য, চোখে পানি না থাকা তার জন্য দুর্ভাগ্যের নিদর্শন। কেননা যারা আল্লাহ, রাসুল, দ্বিন ও পরকালের ব্যাপারে উদাসীন, তাদের চোখেই পানি থাকে না। মহান আল্লাহ এ ব্যাপারে সতর্ক করে বলেন, ‘তোমরা হাসি-ঠাট্টা করছ! কান্না করছ না? তোমরা তো উদাসীন।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৬০-৬১)
হে আল্লাহ! আপনার ভয় ও ভালোবাসায় আমাদের অন্তর পরিপূর্ণ করুন এবং আমাদের চোখে আপনার প্রেমাশ্রু দান করুন। আমিন।
আতাউর রহমান খসরু
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


