নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ মাছ ধরা। এটি জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কেবল পেশা নয়, বরং বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যের অংশও। আর জাতীয় মাছ ইলিশ অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। উপকূলীয় এলাকায় মানুষের আয়ের একমাত্র উৎস মাছ। বছরের পর বছর মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন জেলেরা। তবে নদী ও সমুদ্রে কত প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় কিংবা কত ধরনের মাছ ধরেন জেলেরা, তা অনেকের অজানা। তা নিয়ে আমাদের এ প্রতিবেদন।

নদী-সমুদ্রে কত প্রজাতির মাছ ধরেন জেলেরা
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের নদ-নদী ও সমুদ্রে সবমিলিয়ে ৭৩৫টির বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়। এর মধ্যে স্বাদু পানির ২৬০টি এবং সামুদ্রিক ৪৭৫টি প্রজাতি রয়েছে। সমুদ্রগামী জেলেরা গভীর ও অগভীর সমুদ্র থেকে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ ধরে থাকেন। আর বাণিজ্যিকভাবে নিয়মিত অন্তত ৪০ ধরনের মাছ ধরে থাকেন। বঙ্গোপসাগরের গভীর এবং অগভীর অংশ থেকে মাছগুলো ধরে আনেন তারা। এর মধ্যে জনপ্রিয় প্রজাতি হলো ইলিশ। পাশাপাশি রুপচাঁদা, কালোচাঁদা, লইট্টা এবং কোরাল উল্লেখযোগ্য। রফতানিযোগ্য মাছ টুনা, ম্যাকারেল, সুরমা এবং লাক্ষা ধরেন। সেইসঙ্গে কালো পোপা, লাল পোপা, সাদা পোপা, ছুরি, ফাইস্যা, তাইল্লা, শাপলাপাতা এবং বাইমও ধরেন। দামি মাছের মধ্যে জাভা ভোল বা ভোল কোরাল, যা অত্যন্ত মূল্যবান।
নদীর মাছের মধ্যে আইড়, বাগাড়, রিটা, বোয়াল, রুই, কাতলা, পাঙাশ, চিতল, চিংড়ি, কাঁকড়া, হাঙর, পাবদা, গুলশা, চেওয়া, বউরানি, ট্যাংরা, কাকিলা, বাটা, বেলে, তপসে, ফলি, বৈরালী, মেনি, শোল, গজার, পুঁটি, মলা, ঢেলা, কাঁচকি, চান্দা, চেলা, শিং, মাগুর এবং কই উল্লেখযোগ্য।
কী মাছ পাওয়া যায় পদ্মা-মেঘনায়
ইলিশ ছাড়াও পদ্মা-মেঘনায় আরও অনেক ধরনের মাছ পাওয়া যায়। তবে মাছের প্রজাতির জন্য সমৃদ্ধ পদ্মা। বহু ছোট-বড় নদী-খাল পদ্মা থেকে জন্ম নিয়েছে, মিশেছে অনেক। বড় বড় বিলের যোগ আছে পদ্মার সঙ্গে। পদ্মায় আছে মাছের ডিম ছাড়ার পরিবেশ, আর আছে খাবার।
২০১৪ সালের সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) মূল্যায়ন বলছে, প্রায় ১২০ প্রজাতির মাছের আবাসস্থল পদ্মা। এর মধ্যে আছে কাকিলা (কাইক্কা), ফাসা, কাচকি, চাপিলা, খয়রা, রানি (বউ মাছ), পুইয়া (গুতুম), পইয়া (পুইয়া), মলা (মোয়া), পিয়লি (জয়া), মোরারি, কাতলা, মৃগেল, রাইখোর (রেবা), বাঁশপাতা, বাটা, ভাঙ্গান, কালবাউশ, নান্দিনা, রুই, চেলা, চেলা (কাটারি), ঢেলা, চোলাপুঁটি, কাঞ্চনপুঁটি, সরপুঁটি, জাতপুঁটি, ভাতপুঁটি, তিতপুঁটি, ডারকিনা (ডারকা), খরশোলা, চিতল, ফলৈ, চান্দা, লম্বা চান্দা, রাঙা চান্দা, কই, নাপিত কই, গজার, গাছুয়া (চ্যাং), টাকি, শোল, বেলে, খলিশা, চুনা খলিশা, লাল খলিশা, মেনি, ট্যাংরা, গুলসা ট্যাংরা, বাজারি ট্যাংরা, রিটা, আইড়, গইজা, চেকা, মাগুর, শিং, কাজুলি, ঘাউরা, মুরিবাচা, বাচা, কাটা বাতাসি, শিলং, কানি পাবদা, মধু পাবদা, বোয়াল, বাগাড়, চেনি, গাং ট্যাংরা, বাইম, তারা বাইম, পাকাল বাইম, গোচি, পটকা (টেপা)। এ ছাড়া আছে বেশ কয়েক প্রজাতির চিংড়ি।
নিষিদ্ধ সময়
সামুদ্রিক মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে ২০২৪ সাল থেকে সরকার প্রতি বছর ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিন (বর্তমানে ৫৮ দিন বা পরিবর্তন সাপেক্ষে) সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখে।
নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর ঘেরা সীমান্তবর্তী উপজেলা টেকনাফের মানুষের জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে মাছ ধরা। উপজেলার মানুষের একটি বড় অংশ জীবিকা নির্বাহ করেন এই পেশায়। প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত নৌকা ও ট্রলার নিয়ে তারা পাড়ি জমান নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরে। দুই-চার দিন কিংবা এক সপ্তাহ গভীর সমুদ্রে অবস্থানের পর ফিরে আসেন ঘাটে। সঙ্গে থাকে ৭০ প্রজাতির মাছ। মৌসুমভেদে এই মাছের ধরনও বদলায়। তবে বৈচিত্র্যময় এই মাছের ভান্ডারে দেখা দিচ্ছে উদ্বেগের ছাপ। কারণ গত পাঁচ বছরে অন্তত ১৫ থেকে ২০ প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। সেগুলো কমই পাওয়া যায়।
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, টেকনাফ উপজেলায় নিবন্ধিত (কার্ডধারী) জেলের সংখ্যা ১০ হাজার ৬৮৩ জন। এসব জেলের রয়েছে মোট ১ হাজার ৫৩২টি নৌযান। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ শিকার শেষে জেলেরা সেন্টমার্টিনসহ মোট ৪৭টি ঘাটে ফিরে আসেন। যেখানে তাদের ধরা মাছ বেচাকেনা হয় এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।
নদী-সমুদ্রে কত প্রজাতির মাছ ধরেন জেলেরা
তবে উপকূলীয় জেলে ও গভীর সমুদ্রগামী জেলেদের মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। উপকূলের জেলেরা সাধারণত ছোট নৌকা ও কমশক্তির ইঞ্জিনচালিত নৌযান ব্যবহার করেন, যেখানে নিরাপত্তা সরঞ্জাম প্রায় অনুপস্থিত। অপরদিকে গভীর সমুদ্রগামী জেলেরা বড় ট্রলার নিয়ে সাগরে যান, যেখানে জিপিএস, রাডার এবং উন্নত জালসহ তুলনামূলক আধুনিক ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা থাকে। একসঙ্গে ১০-১৫ জন জেলে যান সাগরে।
জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, মৌসুম ও জালের ধরন অনুযায়ী সাধারণত ৭০ প্রজাতির মাছ শিকার করে থাকেন তারা। এসব মাছ নৌ-ফিশারি ঘাটে এনে জেলে ও ট্রলার মালিকরা বিক্রি করেন। সেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হয়। নাফ নদী ও সাগরের মাছ ধরার ধরন ও পরিমাণে রয়েছে পার্থক্য। নাফ নদীর তুলনায় সাগরে মাছের পরিমাণ অনেক বেশি। সেখানকার মাছের বৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ।
টেকনাফের একাধিক জেলে জানিয়েছেন, তাদের জালে প্রায় সময় ধরে পড়া মাছের মধ্যে রয়েছে ছয় ধরনের পোপা (লাল, কালো, সাদা, দাঁতালো, সিল, মাথা), ছুরি, কালা ছুরি, তাইল্যা, বগা ছুরি, বিভিন্ন প্রজাতির হাঙর (যেমন কেলা, বলি, কান হাঙর), চিংড়ি, লবস্টার, বাগদা, গলদা, লইট্টা, কেট টাইগার, ফাইস্যা, চার প্রজাতির চান্দা, কোরাল, আইড়, বাগাড়, বেলে, অলুয়া, স্যালমন, মাইট্টাসহ ৭০ প্রজাতির মাছ। এ ছাড়া ইলিশ ও ফুইট্যা ইলিশও ধরেন। তবে মাছের ভান্ডারে এখন ধীরে ধীরে ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
মাছ ধরতে নানা ধরনের জাল
তবে একই জাল দিয়ে সব মাছ ধরা যায় না। প্রধানত পাঁচ-ছয় ধরনের জাল দিয়ে জেলারা মাছ ধরেন— (১) কারেন্ট জাল (বোয়াল, আইড়, বাইম, বাটা, বাইলা, পুঁটি মাছ ধরার জন্য); (২) বেড় জাল (বোয়াল, আইড়, বাটা, কাতলা, মৃগেলসহ সব ধরনের ছোট মাছ); (৩) খেপলা জাল (পুঁটি, ইচা, ট্যাংরা, বাইলাসহ অন্যান্য ছোট মাছ); (৪) মোই জাল (বাইম, বাতাসি, টাকি, শোল, গজাল); (৫) ঠেলা জাল (পুঁটি, ট্যাংরা, গুলসা, ইচা)। এ ছাড়া বড় জাল, ভেসাল, ঝাকি, টোইরা, খোরা ও ছটকা জালের ব্যবহার করা হয়।
জেলেরা জানান, যেসব জায়গায় স্রোত, সেখানে বড়শি দিয়ে মাছ ধরতে দেখা যায়। স্বচ্ছ পানিতে মাছ ধরতে কোচ এবং কম পানিতে পলোর ব্যবহারও আছে। আর আছে ইলিশ ধরার জাল। জেলেরা মাছ ধরতে কোন জাল ব্যবহার করবেন, তা নির্ভর করে পানির গভীরতা ও স্রোতের তীব্রতার ওপর। তবে খেপলা জাল সারা বছর ব্যবহার করা হয়।
হারিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতি
একাধিক জেলে জানিয়েছেন, পাঁচ বছরে আগে যেসব মাছ নিয়মিত ধরা পড়তো, এখন সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলো আর জালে উঠছে না। এর মধ্যে রয়েছে বেঙ গুইজ্জা, চড়া গুইজ্যা, পাড়পুলা, চান্দা গুইজ্যা, দনদনা ও চাপিলা ইলিশসহ কয়েকটি প্রজাতি। যেগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। অতিমাত্রায় মাছ ধরা, পরিবেশদূষণ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রজননক্ষেত্রের বিলুপ্তি, পানিপ্রবাহে বাধা, নদী ভরাট হওয়া—এসব কারণে মাছগুলো কমে যাচ্ছে।
মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের নদ-নদী ও সমুদ্রে সবমিলিয়ে ৭৩৫টির বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায়
যা বলছেন জেলেরা
টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সৈকতের সঙ্গে লাগোয়া মহেশখালীয়া ঘাট। সেখানে ১০০-২০০ নৌকা সারি সারি ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তিন দিন সাগরে মাছ শিকার শেষে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের মহেশখালীয়া ঘাটে ফেরেন জেলে নুর আমিন ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। এ সময় মাছ কিনতে ভিড় করেন মাছ ব্যবসায়ীরা।
মহেশখালীয়া ঘাটের জেলে ও মাছ ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম বলেন, ‘৩০ বছর ধরে মাছ ধরে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছি। কখনও ট্রলার নিয়ে সাগরে মাছ শিকারে যাই। কখনও নিজে মাছ কিনে বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিই। ঘাটে জেলেদের মুখ দেখলে বুঝতে পারি কী ধরনের মাছ ধরে এনেছেন।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী মিলে এখানকার জেলেরা ৭০ প্রজাতির মাছ ধরেন। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে কিছু মাছ নাই হয়ে গেছে। এটি আমাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ।’
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ‘বঙ্গোপসাগর ও নাফ নদী মিলিয়ে জেলেদের জালে বর্তমানে ৬০-৭০ প্রজাতির মাছ ধরা পড়ে। মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণে নিয়ম মেনে মাছ আহরণ নিশ্চিত করতে জেলেদের সবসময় দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছি আমরা।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


