জ্বালানি তেল ও এলপি গ্যাসের দাম এক দফায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন খরচ বাড়া এবং শিল্প খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রোববার (১৯ এপ্রিল) থেকে কার্যকর নতুন দরে ডিজেলের লিটার ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে।
কেরোসিনের দামও লিটারে ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইদিনে রান্নার কাজে ব্যবহৃত এলপিজির দামও বাড়ানো হয়েছে।
১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দর রোববার সন্ধ্যা থেকেই কার্যকর হয়।
জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিবহন খাতে ভাড়া বৃদ্ধির চাপ তৈরি হয়েছে। সকালে দাম বাড়ার ঘোষণার পর বিকেলের মধ্যেই দূরপাল্লার বাস ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। সংগঠনটির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, তেলের দাম বাড়লেও ভাড়া সমন্বয়ের কোনো নির্দেশনা না থাকায় মালিকরা লোকসানে পড়ছেন। তিনি কিলোমিটার প্রতি ভাড়া ২ টাকা ১২ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা করার দাবি জানান।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে প্রতিদিন সারা দেশ থেকে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক আসে। এসব পরিবহনে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যয় বাড়বে, যা খুচরা বাজারে দামের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরু হয়েছে গত ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখ। হরমুজ প্রনালী হয়ে আসার তেলের সরবরাহ বাধাগ্রস্থ হয়। এর ফলে দেশে জ্বালানির সংকট দেখা দেয়। সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহ অব্যাহত থাকলেও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টাও দেখা গেছে।
এসব কিছু কারণে ইতোমধ্যে কাঁচাবাজারে পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে উঠে গেছে, যা রোজার সময় ৬০ টাকার মধ্যে ছিল। ডিমের ডজনও মাসখানেকের ব্যবধানে ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১২৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল পরিবহনেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি খাতেও এর সরাসরি প্রভাব পড়বে। দেশে সেঁচকাজে ব্যাপকভাবে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহৃত হয়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়ায় ধানসহ অন্যান্য ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে শিল্পকারখানা, শপিং মল ও হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়, যা মূলত ডিজেলনির্ভর। জ্বালানির দাম বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়বে এবং এর প্রভাব পণ্য ও সেবার খরচ বেশি পড়বে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা এতে বেশি চাপে পড়বেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে, রাইড শেয়ারিং খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। পাঠাও ও উবারসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত চালকদের পাশাপাশি অফলাইনে কাজ করা চালকরাও জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। অনেক চালক প্রতি রাইডে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ৭০ টাকা ভাড়া দাবি করছেন।
এ পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরাও চাপে পড়েছেন। সন্ধ্যার পর শপিং মল ও মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিক্রি কমে গেছে।
ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। সীমিত আয়ের মানুষ, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষদের পক্ষে এই অস্থিরতার ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে নতুন করে জ্বালানির দাম বাড়লেও মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কেবল জ্বালানির দামের ওপর নির্ভর করে না; বরং বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠক শেষে দেশে ফিরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সরকার যদি জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব সীমিত রাখা সম্ভব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমেছে, যা ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ।
তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনও বেশি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, দেশে প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি থাকায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি চাপে রয়েছে। জ্বালানি তেল ও এলপিজির দাম বাড়ায় এই চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানির দাম বাড়ানো মানেই মূল্যস্ফীতি ২৪ ঘন্টার মধ্যে হুহু করে বেড়ে যাওয়া। ঢাকাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনোমিক রিসার্চ সেন্টারের (পিটিইআরসি) চেয়ারম্যান মো. মাজেদুল হক বলেন, ডিজেলের দাম আরেকটু কম বাড়ানোর দরকার ছিল। ৫-৭ টাকা বাড়ানো যেত। এক ধাক্কায় ১৫ টাকা বাড়ানো অর্থনীতির ওপর অনেক বড় চাপ তৈরি করবে। কারণ ডিজেল ব্যবহৃত হয় সবচেয়ে বেশি। গরিবদের কাজে বেশি ব্যবহার হয় ডিজেল। যেমন কৃষি কাজ ও পিকআপ বা ট্রাকে ডিজেলের ব্যবহার হয়। অকটেনকে বলা হয় ধনীতের জ্বালানি।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তিনি মনে করেন, দেশের জনগণের ওপর জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে অনেক কষ্ট পেতে হবে। মাজেদুল হক বলেন, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ফলে ‘কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন’ বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। পরিবহন, উৎপাদন ও বিপণনের প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়ায় শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব ভোক্তার ওপরই পড়বে। এ পরিস্থিতিতে বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখা এবং নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ জরুরি।
সূত্র : বাংলানিউজ
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


