বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কোটা নীতির (রেশনিং) কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ প্রায় ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পাম্প মালিক ও পরিবেশকরা। তারা বলছেন, কাগজে সরবরাহ কমানো হয়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বাস্তবে তা আরও বেশি কমে গিয়ে বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।

মাঠের চিত্রেও এ কথার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এক সপ্তাহের বেশি হলেও জ্বালানি তেল নিয়ে ভোগান্তি কমেনি। সরকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। দেড়-দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করে তেল নিতে হচ্ছে। মজুত ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেক পাম্প এক বেলা বন্ধ রাখা হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে তেল কেনা নিয়ে মারামারির ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি সামলাতে এবার সরকারি ছুটির দিন (শুক্র ও শনিবার) ডিপো খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছে বিপিসি।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে ব্যারেলে শত ডলার পেরিয়েছে অপরিশোধিত (ক্রুড) তেলের দাম। বেড়েছে এলএনজির দামও। দাম বাড়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি কিনতে খরচ বেশি হচ্ছে। পরিস্থিতি সামলাতে বাড়তি অর্থ চেয়েছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়। তারা এপ্রিল-মে মাসের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে অর্থ বিভাগের কাছে ৩১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চেয়েছে। এর মধ্যে রামপাল, পায়রা ও নোরিনকো বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার জন্য সাত হাজার ৭০০ কোটি টাকা, বিপিসির তেল আমদানির জন্য সাত হাজার কোটি এবং এলএনজি আমদানিতে ১৭ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। এখন দাম বাড়লেও বিপিসি গত কয়েক বছর ধরে লাভে আছে। গত অর্থবছরেও চার হাজার ৩০০ কোটি টাকা লাভ করেছে। তাই তার এখনই অর্থ চাওয়ার প্রয়োজন দেখছেন না খাত-সংশ্লিষ্টরা। তবে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি প্রায় দ্বিগুণ দামে কিনতে হচ্ছে। চলতি মাসের জন্য কেনা দুই কার্গো এবং এপ্রিল মাসের জন্য কেনা তিন কার্গো এলএনজিতে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হবে বাংলাদেশের।
তেল ভোগান্তির মূলে রেশনিং
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীতে এক সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের আহ্বায়ক সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম কাবুল বলেন, সংকটের শুরু গুজব থেকে। বিপিসি কারও সঙ্গে আলোচনা ছাড়া তেল সরবরাহ ও বিক্রয়ে রেশনিং শুরু করে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, দেশে তেলের মজুতে সংকট নেই। বিপিসির ভুল নীতির কারণে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কাবুল বলেন, গত রোববার থেকে বিপিসি প্রতিটি পাম্পের বরাদ্দ থেকে ২৫ শতাংশ সরবরাহ কমিয়ে দেয়। তাঁর মতে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিলে তেলের চাহিদা তুলনামূলক বেশি থাকে। তবে মার্চের পর সেচের চাহিদা কমে যায়।
কিন্তু বিপিসি মার্চ থেকে জুনের গড় উত্তোলনের ভিত্তিতে সরবরাহ কমিয়েছে, এটা বাস্তবসম্মত হয়নি। এ ছাড়া পাম্পগুলো সাধারণত সপ্তাহে সর্বোচ্চ পাঁচ দিন এবং মাসে গড়ে ২০ থেকে ২২ দিন ডিপো থেকে তেল আনে। কিন্তু বিপিসি ৩০ দিন ধরে দৈনিক কোটা নির্ধারণ করেছে। এতে কাগজে ২৫ শতাংশ সরবরাহ কম দেখালেও বাস্তবে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত তেল কম আসছে। পাশাপাশি ডিপোতে কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও ডিপোগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে রোববার ও বৃহস্পতিবার বেশি চাহিদা থাকলেও ডিপোর সীমাবদ্ধতায় তা সামাল দেওয়া যাচ্ছে না।
কাবুল বলেন, অনেক পাম্পের বরাদ্দ এত কমে গেছে, পাঁচ হাজার থেকে ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষম ট্যাঙ্কলরি পূর্ণ লোডে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কমিশনের চেয়ে পরিবহন খরচ বেশি হচ্ছে। তাই অনেক পাম্প মালিক তেল কেনা বন্ধ রেখেছেন।
কাবুলের বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় তেজগাঁও এলাকার এক ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপকের বক্তব্যে। মিলন নামের ওই কর্মী জানান, তাদের পাম্পে দিনে ২৭ হাজার লিটার ডিজেল ও ২৭ হাজার লিটার অকটেনের চাহিদা রয়েছে। সংকট শুরুর পর সামান্য তেল পাচ্ছেন। ফলে দিনের বড় সময় পাম্প বন্ধ রেখে অলস বসে থাকতে হয়। তিনি বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে ১৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন ও ১৩ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল আসছিল। বুধবার কোনো তেল আসেনি। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অকটেন ছিল না। দুপুরের দিকে ডিজেলও শেষ হয়ে গেছে। তবে বিকেলে ৯ হাজার লিটার করে ডিজেল ও অকটেন আসে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
কোথাও তেল নেই, কোথাও অপেক্ষা ঘণ্টা ধরে
গতকাল ঢাকার তেজগাঁও এলাকার সিটি, সততা, নাবিস্কো মোড়ের সাউদার্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। গতকাল সন্ধ্যায় সিটি ফিলিং স্টেশনের সামেন এক ট্রাকচালক জানান, তিনি দেড় ঘণ্টা ধরে লাইনে আাছেন। সামনে ১০টি গাড়ি রয়েছে। আরও আধা ঘণ্টা সময় লাগতে পারে। সাউদার্ন ফিলিং স্টেশনে পাঠাও রাইডার আকবর জানান, এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর পাঁচ লিটার তেল পেয়েছেন। এ ছাড়া মহাখালী, আসাদগেট, মিরপুর, মালিবাগ, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে অনেক পাম্প বন্ধ রাখতে দেখা গেছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


