মানুষ এই সুন্দর পৃথিবীতে বাস করতে করতে ধীরে ধীরে এর মোহে জড়িয়ে পড়ে। দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রতি আকর্ষণ এমনভাবে হৃদয় দখল করে নেয় যে অনেকেই ন্যায়-অন্যায় ভুলে যায়। সম্পদের লোভে মানুষ জুলুম-অত্যাচার করে, অন্যের অধিকার হরণ করে, এমনকি হত্যার মতো জঘন্য অপরাধেও লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না।

হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালি (রহ.) সতর্ক করে বলেছেন, মানুষ যদি একবার দুনিয়ার মোহে আটকে যায়, তবে সেখান থেকে বের হওয়া কঠিন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ অর্জনের চেষ্টা মানুষকে নানাবিধ ব্যস্ততায় নিমজ্জিত করে, যার ফলে তার ইবাদত-বন্দেগি ও নৈতিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুনিয়ার সম্পদ যত বাড়ে, ততই তার চাহিদা বাড়তে থাকে। এই পৃথিবী যেন মরীচিকার মতো—দেখতে ঝলমলে, কিন্তু স্থায়ী নয়।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সম্পদ ও সন্তান আসলে পরীক্ষা। কোরআন-এ বলা হয়েছে: “জেনে রাখো, তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানসন্ততি পরীক্ষা ছাড়া কিছু নয়।” (সুরা আনফাল, আয়াত ২৮)। অর্থাৎ এগুলো মানুষকে যাচাই করার মাধ্যম। কিন্তু মানুষ অনেক সময় এ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়। সম্পদ বাড়ানোর নেশায় সে ঘুষ, দুর্নীতি, প্রতারণা ও অনাচারে জড়িয়ে পড়ে। সমাজে হিংসা-বিদ্বেষ বাড়ে, শান্তি নষ্ট হয়।
আল্লাহ আরও বলেন: “হে মানবজাতি! তোমাদের অবাধ্য আচরণ তোমাদের নিজেদের বিপদের কারণ। দুনিয়ার জীবন সাময়িক ভোগমাত্র; এরপর তোমাদের আমার কাছেই ফিরে আসতে হবে।” (সুরা ইউনুস, আয়াত ২৩)। এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। একদিন সবকিছু ছেড়ে মানুষকে কবরে যেতে হবে। বাড়ি-ঘর, সম্পদ, পরিবার—কিছুই সঙ্গে যাবে না; যাবে কেবল আমল।
সুরা তাকাসুরে বলা হয়েছে: “প্রাচুর্যের লালসা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, যতক্ষণ না তোমরা কবরের সাক্ষাৎ পাও।” (আয়াত ১-২)। অর্থাৎ অতিরিক্ত সম্পদের প্রতিযোগিতা মানুষকে পরকাল থেকে বিমুখ করে দেয়। অথচ কবরই আমাদের অনিবার্য গন্তব্য।
আল্লাহ তাআলা আরও ঘোষণা করেছেন: “তোমাদের কাছে যা আছে তা শেষ হয়ে যাবে, আর আল্লাহর কাছে যা আছে তা স্থায়ী।” (সুরা নাহল, আয়াত ৯৬)। তাই দুনিয়ার ধন-সম্পদের মোহে পড়ে যারা অন্যায়-অবিচারে লিপ্ত হয়, তারা মূলত নিজেদের ক্ষতিই ডেকে আনে।
এই পৃথিবীকে আল্লাহ মনোরম ও আকর্ষণীয় করেছেন আমাদের পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। কিন্তু মানুষ যদি সচেতন হয়, তবে সে বুঝতে পারবে—এই জীবন খুবই স্বল্পকালীন। সুরা মুমিনুনে বলা হয়েছে: “তোমরা দুনিয়াতে অল্প সময়ই অবস্থান করেছিলে, যদি জানতে।” (আয়াত ১১৪)।
সুতরাং বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার প্রতি অন্ধ মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলা। সৎ জীবনযাপন, ন্যায়পরায়ণতা ও নেক আমলই পরকালের প্রকৃত পাথেয়। হাসি-আনন্দ, ভোগ-বিলাস সবই একদিন শেষ হবে; কিন্তু নেক আমলের প্রতিদান চিরস্থায়ী। তাই দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে নয়, বরং পরকালের স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে আমাদের জীবন পরিচালিত হওয়াই উচিত।
লেখক : মাওলানা মুহম্মাদ জিয়াউদ্দিন
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


