রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢুকে ভাঙচুর ও একজন শিক্ষিকার সঙ্গে অশোভন আচরণ করায় উপজেলার জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে দলটি।

শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বহিষ্কারের এ তথ্য জানান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাজশাহীর দুর্গাপুরে দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ঢুকে ভাঙচুর ও একজন শিক্ষিকার সঙ্গে জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীর অশোভন আচরণের ঘটনা ঘটেছে। দলীয় নীতি, আদর্শ ও শৃঙ্খলা পরিপন্থী কার্যকলাপে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগে আকবর আলীকে বিএনপির প্রাথমিক সদস্যসহ সব পর্যায়ের দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার দাওকান্দি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে এক নারী প্রভাষক ডেমোনেস্ট্রেটরকে (প্রদর্শক) জুতা দিয়ে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা আড়াইটার দিকে ঘটে। ওই সময় কলেজে ২০২৪ সালের ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষা চলছিল। কেন্দ্রে পরীক্ষা চলা অবস্থায় কলেজ ও আশপাশের ১০০ গজ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি এবং সকাল থেকেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল। এ ঘটনার কিছু ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এ সময় আরও কয়েকজন শিক্ষকের ওপর হামলা এবং কলেজ কক্ষে ভাঙচুর চালানো হয়। এতে অধ্যক্ষসহ অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি কক্ষে কয়েক ব্যক্তি বসে আছেন এবং সেখানে কিছু আলোচনা চলছিল। একপর্যায়ে এক ব্যক্তিকে কলেজের নারী ডেমোনেস্ট্রেটর থাপ্পড় মারেন। এরপর ওই ব্যক্তি তার জুতা দিয়ে শিক্ষিকার পেটাতে থাকেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুপুরে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা অধ্যক্ষের কক্ষে প্রবেশ করে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বাগবিতণ্ডায় জড়ান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি আকবর আলীকে শিক্ষিকা আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে থাপ্পড় মারের। পরে প্রকাশ্যে নিজের জুতা খুলে শিক্ষিকাকে আঘাত করতে থাকেন ওই বিএনপি নেতা। অধ্যক্ষসহ অন্য শিক্ষকরা তাদের নিবৃত্তের চেষ্টা করলে তাঁরাও হামলার শিকার হয়ে আহত হন। ঘটনাটি অধ্যক্ষের কক্ষেই ঘটে এবং সেখানে পুলিশ সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।
হামলায় আহতদের মধ্যে আছেন কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক, প্রভাষক আলেয়া খাতুন হীরা, অধ্যাপক রেজাউল করিম আলমসহ আরও দুই কর্মচারী। হামলার খবর পেয়ে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অতিরিক্ত পুলিশ নিয়ে কলেজে উপস্থিত হন। তিনি শিক্ষক ও বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে বসে দফায় দফায় পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন।
আহত শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, আকবর আলীসহ স্থানীয় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৩০-৪০ জন নেতাকর্মী হামলা চালান। তাদের মধ্যে আফাজ আলী, শাহাদ আলী, জয়নাল আলী, এজদার আলী, রুস্তম আলী ও জামিনুর ইসলাম জয় রয়েছেন।
অভিযুক্ত বিএনপির কর্মী শাহাদ আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘কলেজের ডেমোনেস্ট্রেটর আলেয়া জনসমুখে আমার গায়ে প্রথমে হাত তুলেছেন। পরে আমি সেন্ডেল দিয়ে তাকে আঘাত করেছি।’
কলেজের ডেমোনেস্ট্রেটর আলেয়া খাতুন হীরা বলেন, ‘পুকুরের টাকা নিয়ে তারা কলেজের অধ্যক্ষকে মারধর করছিল। প্রতিবাদ করায় আমাকে প্রকাশ্যে জুতা দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।’
অন্যদিকে, জয়নগর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আকবর আলী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আগের দুর্নীতির হিসাব চাওয়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয় এবং শিক্ষকদের পক্ষ থেকেই আগে হামলা করা হয়।
কলেজের অধ্যক্ষ আবদুর রাজ্জাক জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করছিল। তিনি কোনো পক্ষকে প্রশ্রয় না দেওয়ায় এ হামলার শিকার হয়েছেন।
দুর্গাপুর থানার পরিদর্শক তদন্ত (ওসি) রফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো পক্ষই এখনো থানায় অভিযোগ করতে আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আপনার সামনেই অধ্যক্ষের কক্ষে মারধরের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে- এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেকগুলো ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। একটা ভিডিওতে আমাকে কেউ দেখাতে পারবে না। আমি ঘটনার সময় ছিলাম না।’
নারী ডেমোনেস্ট্রেটরকে জুতাপেটার ভিডিও ভাইরালের পাশাপাশি আরো কিছু ভিডিও এসেছে বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে। ওই ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশের পর পরই আকবর আলী ও আলেয়া খাতুন হীরার মধ্যে বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। এক পর্যায়ে হীরা আকবর আলীকে মাঠের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। আকবর আলী ওঠার চেষ্টা করলে তাকে আবারও ফেলে দেওয়া হয়।
স্থানীয় বিএনপি নেতা আকবর আলী দাবি করেন, ‘ওই কলেজে দীর্ঘসময় অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে কলেজের জমি, গাছপালা বিক্রিসহ বিভিন্নখাতে ব্যাপক অনিয়ম দুর্নীতি করেছেন মোজাম্মেল হক। সেই সময়ের হিসাবের ফিরিস্তি বারবার চাইলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের দেননি। উল্টো আমাদেরকে ভয়ভীতি দেখান। এমনকি ঘটনার দিনে কলেজের শিক্ষক আলেয়া খাতুন হীরা প্রথমে আমাদের উপরে হামলা করেন এবং কয়েকজন নেতাকর্মীকে চড়-থাপ্পড় মারেন। যার ফলশ্রুতিতে নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে কয়েকজন শিক্ষককে মারধর করেছে এবং অফিস কক্ষ অফিস ভাঙচুর করেছে।’
আলেয়া খাতুন হীরা অভিযোগ করেন, ‘বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় কলেজে এসে হিসাব-নিকাশ চাইতেন। আসলে তারা চাঁদার দাবিতে আসতেন। অধ্যক্ষ নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন। বিধায় কোনো পক্ষকেই সেইভাবে গ্রহণ করতেন না। এটাই অপরাধ ছিল অধ্যক্ষের। আর একজন শিক্ষক বা সহকর্মী হিসেবে অধ্যক্ষকের পাশে থাকাটাই আমার অপরাধ। আমি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা হয়েও কেন অধ্যক্ষের পক্ষ নিয়েছি এটাও আমার একটা অপরাধ।’
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


