বাগেরহাটে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তাদের ৯ মাসের সন্তান নাজিমের মৃত্যু নিয়ে দুই পরিবার ভিন্নমুখী দাবি তুলেছে। নিহতের পরিবারের মতে, কানিজ আত্মহত্যা করতে পারতেন না, অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ি বলছে, এটি আত্মহত্যা। তবে ঘটনার তদন্তে কাজ করছে পুলিশ।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে সাদ্দামের বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে গিয়ে এ প্রতিবেদক দেখতে পান সেখানে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবারের লোকজনের ভিড়। সাদ্দামের বাড়িটি একতলা। সাদ্দামরা তিন ভাই ও তিন বোন। বাবা একরাম হাওলাদার মারা গেছেন ৫ বছর আগে। এক তলা এই ভবনে সাদ্দামের মা, এক বোন ও সাদ্দামের স্ত্রী-সন্তান থাকতেন।
সাবেকডাঙ্গা গ্রামের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কথা হলে এ প্রতিবেদককে সাদ্দামের মা দেলোয়ারা একরাম জানান, গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ভাতিজীর বিয়েতে অংশ নিতে বাগেরহাট শহরের বগা ক্লিনিক এলাকায় যান। তখন তার পুত্রবধূ, নাতি, এক মেয়ে ও মেয়ের ছেলে বাড়িতে ছিল। পুত্রবধূ কানিজের সঙ্গে কথা ছিল, দুপুরের দিকে তিনিও ওই বিয়ে বাড়িতে যাবেন। ১টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাদ্দামের মাকে পাশের বাড়ি থেকে মোবাইল ফোনে জানানো হয়, তার পুত্রবধূ গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। পরে তারা ছুটে আসেন।
সাদ্দামের মা বলেন, “আমার খুব শান্তির সংসার ছিল। বউ মা ও নাতনিকে নিয়ে আমি থাকতাম বাড়িতে। বউমার সঙ্গে আমার খুবই ভাল সম্পর্ক। আমার সংসারে কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু কেন যে ও এমন করল জানি না।”
সাদ্দামের ভাই প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমাদের সংসারে কোনো অভাব-অনাটোন ছিল না। আমার ভাই দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন, এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। যারা এসব প্রচার করছেন, তারা হয়ত কোনো উদ্দেশ্য সাধনের জন্য করছেন।”
তিনি আরো বলেন, “ভাবি (কানিজ) আমাকে কয়েকবার বলেছেন যে, দুই মাস হয়ে যায়, তার বাবা তাকে এবং তার ছেলেকে দেখতে আসেন না। অনেকে ভাবিকে বলেছেন, যে তার স্বামী (সাদ্দাম) আর কোনো দিন জেল থেকে বের হতে পারবেন না। এসব নিয়েও, ভাবির মধ্যে হতাশা ছিল।”
এদিকে, শুক্রবার সাদ্দামের শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বলেছিলেন, তার মেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ নিয়ে তার কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু শনিবার সাদ্দামের শ্বশুর রুহুল আমিন হাওলাদার বাদী হয়ে বাগেরহাট মডেল থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।
তিনি বলেন, “আমার মেয়েকে হয়ত ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, আর আমার নাতি কিভাবে মারা গেল এটা জানার জন্য হত্যা মামলা করা হয়েছে। প্রশাসন যা ভালো মনে করেছে তাই করেছে। তদন্তে সঠিক বিষয় বেরিয়ে আসবে।”
নিহত কানিজের ভাই শাহনেওয়াজ আমিন শুভ বলেন, “আমার বোন আত্মহত্যা করার মত মানুষ না। সে আত্মহত্যা করতে পারে না। আমরা প্রথমে যদিও বলেছিলাম, সে আত্মহত্যা করেছে, কিন্তু নানা বিষয় চিন্তা করে আমরা মনে করছি, সে আত্মহত্যা করেনি। আত্মহত্যার পরে সাদ্দামের পরিবারের যে ব্যবহার তাতে মনে হয়েছে, কোনো সমস্যা আছে।”
সাদ্দামের দ্বিতীয় বিয়ে সম্পর্কে শুভ বলেন, “কয়েকজনের কাছে শুনেছি, দ্বিতীয় স্ত্রীর পরিবারের লোকজন সাদ্দামের বাড়িতে এসেছিল। এরপর থেকে আমার বোনের মন খারাপ ছিল।” এ বিষয়ে বোনের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে কিনা এবং আপনাকে কে বলেছে এমন প্রশ্ন করলে, শুভ বলেন, “আমি শুনেছি। বোনও এ বিষয়ে আমাকে কিছু জানায়নি।”
শনিরার দুপুরে বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে মা ও ছেলের মরদেহ সাবেকডাঙ্গা গ্রামে কানিজের বাবার বাড়িতে আনা হয়। সেখানে বিকেল সোয়া চারটার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয় তাদের মরদেহ। সেখানে স্ত্রী-সন্তানের লাশ শেষবারের মতো দেখেন সাদ্দাম।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, মানবিক দিক বিবেচনা মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের সঙ্গে সাদ্দামের পরিবারের ছয় সদস্যকে কারা ফটকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়।
কানিজ ও সাদ্দাম নিজেদের পছন্দে কয়েক বছর আগে বিয়ে করেন। সন্তানের জন্মের আগে থেকেই সাদ্দাম কারাগারে আছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার হন সাদ্দাম।
সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদন করা তার মামা হেমায়েত হোসেন বলেন, “আমি আবেদন করেছিলাম। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু যশোর জেলে তাই আমাদের প্যারোলে মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। পরে বাগেরহাটের জেল সুপারের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি বলেছেন, আমাদের কোন সুযোগ নেই, আপনারা যশোরে মরদেহ নিয়ে দেখা করিয়ে আসেন। পরে আমরা যশোরে দেখা করিয়েছি। সেখানেও ৪-৫ মিনিট সময় দিয়েছে মাত্র।”
তিনি আরো বলেন, “বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও কারাগার থেকে যদি আমাদের বলা হত, যশোরে আবেদন করেন, তাহলে আমরা যশোরে আবেদন করতাম। কিন্তু আমাদের কেউ জানায়নি, যে যশোরে আবেদন করলে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারে।”
প্যারোলের বিষয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “প্যারোলের একটি আবেদন নিয়ে এসেছিল। তাদের বুঝিয়ে বলা হয়েছে। যেহেতু, সে (সাদ্দাম) আছে যশোরের কারাগারে, আবেদন করতে হবে সেখানকার (যশোরের) জেলা প্রশাসক বা জেল সুপারের কাছে। প্যারোলে মুক্তি পেলে শুধুমাত্র ওই জেলার মধ্যে তার প্যারোলের হুকুমটা কার্যকর হবে। এখানকার প্রশাসন তাদের বিষয়ে যশোর জেলা কারাগারেও বলে দিয়েছিল। কারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, যেন সুন্দর ও সঠিকভাবে স্বজনের লাশ দেখতে পারেন। আমরা স্বজনদের সেখানে যাওয়া এবং দেখার বিষয়ে সহযোগিতা করেছি।”
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ হাছান চৌধুরী বলেন, “মৃত্যুর বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। যেসব ধোয়াশা আছে, সেগুলো তদন্তের বেরিয়ে আসবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


