Advertisement

অভাবের সংসারে একটু সচ্ছলতার আশায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন নারী শ্রমিকরা। ক্ষেত-খামারে কাজ করতে গিয়ে শুনতে হয় ঠাট্টা-বিদ্রুপ। কিন্তু সমান কাজ করেও পুরুষের অর্ধেক মজুরি পান একজন নারী শ্রমিক।

পুরুষের অর্ধেক মজুরি

দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নদী ভাঙন কবলিত। নিম্ন আয়ের পরিবারের সংখ্যা বেশি। ৭০ শতাংশই দিন এনে দিন খায়। পুরুষদের কেউ রিকশা-ভ্যান চালায়। কেউ ক্ষেত-খামারে দিনমজুরি করে, আবার ঢাকায় গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজও করে। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে স্বামীর একার আয়ে সংসার ঠিকমতো চলছিল না। ফলে সচ্ছলতার আশায় কৃষি কাজে নেমে পড়েন নারীরা। এই উপজেলার কয়েক হাজার নারী শ্রমিক মরিচ তোলা, ভুট্টা তোলা, ধান কাটা, আখ কাটা, নিড়ানির কাজ করে থাকেন। কিন্তু একজন নারী শ্রমিক একজন পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করলেও মজুরি পান অর্ধেক। এই অঞ্চলে সময় ভেদে পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। কিন্তু নারী শ্রমিকের মজুরি ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে প্রতি বছর মহান মে দিবস পালিত হয়, কিন্তু তাদের বঞ্চনা শেষ হয় না।

স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে কৃষি শ্রমিক মোমেনা বেগমের অভাবের সংসার। তাঁর স্বামী দিলদার আলী কখনও রিকশা চালান, আবার কখনও কৃষি কাজ করেন। সবসময় কাজ জোটে না বলে স্বামীর একার আয়ে সংসার চলছে না। তাই ক্ষেত-খামারে কাজ করতে হয় মোমেনা বেগমকে। তিনি বলেন, অনেকেই ঠাট্টা করে ‘মেয়ে মানুষ, ক্ষেত-খামারে কাজ করে’। তাদের উদ্দেশে মোমেনা বেগমের মতো নারীরা প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘কাম (কাজ) না কইল্লে খামু কী?’

মোমেনা বেগমের বাড়ি দেওয়ানগঞ্জের পূর্ব কাজলাপাড়া আদর্শ গ্রামে। এই গ্রামে বসবাস করে ভূমিহীন ৬০টির মতো পরিবার। বিভিন্ন স্থান থেকে অন্তত ৩০ বছর আগে এই গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন তারা। দিন এনে দিন খান, সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। কাজ জুটলে পেটে ভাত, না জুটলে উপোস থাকতে হয়। অভাব-অভিযোগ থাকলেও শোনার কেউ নেই। সরকারি সাহায্য বলতে বছরে দুই ঈদে মাত্র কয়েক কেজি চাল জোটে।

মধ্যেরচরের আজিরন বেগম বলেন, ‘আমরা পুরুষ শ্রমিকের সমান কাজ করি। কিন্তু বরাবরই পুরুষ শ্রমিকদের অর্ধেক মজুরি পাই। নারী বলে আমরা মজুরি বৈষম্যের শিকার। সংসারের অভাবে ক্ষেতে খামারে কাজ করি। পুরুষদের সমান মজুরির নিশ্চয়তা চাই আমরা।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মো. জহুরুল হোসেন জানান, এই অঞ্চলে শিল্পকারখানা নেই। কৃষিনির্ভর এই এলাকার অনেক নারী তাই প্রয়োজনের তাগিদে ক্ষেত-খামারে কৃষি কাজ করেন। মজুরি বৈষম্যের বিষয়ে সবাইকে বিবেকবান ও সচেতন হতে হবে। যাতে সমান কাজ করে নারী শ্রমিকরা পুরুষদের সমান মজুরি পান। উপজেলা পর্যায়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পে পুরুষদের পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। প্রকল্পগুলোতে নারী শ্রমিকদের কোনো মজুরি বৈষম্য নেই।

নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে চার হাজারের বেশি শ্রমিক পাথরভাঙা ও পাথর ওঠা-নামার কাজে জড়িত। তবে এই বন্দর দিয়ে নিয়মিত কয়লা ও পাথর না আসায় শ্রমিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দেড় হাজারে। এই অঞ্চলে তেমন কোনো কর্মসংস্থান না থাকায় শ্রমিকরা কম মজুরিতেই পাথর ভাঙার কাজ করে সংসার চালান। তাদের বড় একটি অংশ নারী।

তাদেরই একজন ছামিরুন (৪৮)। স্বামী মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। দুই সন্তান রয়েছে তাঁর সংসারে। জায়গাজমি বলতে সামান্য বাড়িভিটা। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বন্দরে পাথর ভাঙার কাজ করে মজুরি পান ৩২০ টাকা। তাঁর ভাষ্য, মজুরির এই টাকা দিয়ে তাদের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। পরিবারের লোকজনের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করতে পারেন না। কোনোদিন কাজ বন্ধ থাকলে সেদিন থাকতে হয় অনাহারে-অর্ধাহারে। সংসারে খরচ বেড়েছে। সংসার চালাতে অন্যের কাছে ধারদেনাও করতে হয়। পাথর ভাঙার কাজে মজুরি ছাড়া বাড়তি কোনো সুযোগ-সুবিধা পান না।

জানা গেছে, মাত্র ৩০০ টাকা বেতনে কাজ করেন তারা। এই আয় দিয়ে তাদের সংসার ভালো করে চলে না। পাথর ভাঙার কঠিন এই কাজে রয়েছে শ্রমিকদের মৃত্যুর ঝুঁকিও। যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা, সেখানে স্বাস্থ্যের প্রতি নজর দেওয়ারও সুযোগ নেই তাদের। ফলে প্রতিনিয়ত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। অসুস্থ হলে চিকিৎসার একমাত্র অবলম্বন স্থানীয় হাতুড়ে ডাক্তার। অনেকের ভাষ্য, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাজ করার সময় মাস্ক, চশমা, গ্লাভস ব্যবহার ঝামেলার। তবে বন্দরের ব্যবসায়ী বলছেন, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে তাদের রয়েছে গাফিলতি।

বাতকুচি এলাকার আঞ্জুয়ারা খাতুন জানান, দৈনিক ৩২০ টাকা মজুরি পান। বাজারে গেলে এই টাকা দিয়ে কিছুই হয় না। কোনো রকমে দিন কাটছে তাদের।
হোমার দিয়ে পাথর টুকরা করার কাজ করেন আফসার আলী। তিনি বলেন, ‘আগের মতো কাজ নেই। মাঝেমধ্যেই কাজ বন্ধ থাকে। দিবস দিয়া কি করমু? কাজ করে খাই।’

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

বন্দরের লোড-আনলোড শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সুজন মিয়ার ভাষ্য, শ্রমিকদের জন্য তাদের সমিতির নিয়ম অনুযায়ী সহযোগিতা করে থাকেন। কোনো শ্রমিক অসুস্থ ও আহত হলে চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ দেওয়া হয়। এ ছাড়া কোনো শ্রমিক মারা গেলে অথবা তাদের সদস্যদের বিয়েশাদিতেও সহযোগিতা করা হয়। শ্রমিকদের আনন্দ-বিনোদনের বিষয়ে তিনি বলেন, মহান মে দিবস উপলক্ষে শুক্রবার শ্রমিকদের নিয়ে সাফারি পার্কে আনন্দ ভ্রমণে যাবেন তারা।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.