পবিত্র কোরআন একটি জীবন্ত মোজেজা। এর প্রতিটি শব্দ একেকটি সাগর মহাসাগরের চেয়েও গভীর। পৃথিবীর সব সমুদ্রের পানি যদি কালি হয় আর সব গাছ যদি কলম বানানো হয়, তারপর দুনিয়ার মানুষ যদি কালামে পাকের তাফসির লেখা শুরু করে, কালি কলম ও মানুষের সামর্থ্য শেষ হয়ে যাবে কিন্তু কালামে হাকিমের একটি শব্দের ব্যাখ্যা লিখেও শেষ করা যাবে না।

কথাগুলো যিনি বলছিলেন তিনি মস্ত বড় আল্লাহর অলি। এক শীতের রাতে খাস কিছু মুরিদান নিয়ে বসেছিলেন জিকিরের মাহফিলে। সৌভাগ্যক্রমে সে মাহফিলে আমিও ছিলাম। কোরআনের একটি শব্দের ব্যাখ্যা লিখতে গিয়ে সমুদ্রের সব পানি শেষ হয়ে যাবে বিষয়টি সেই মজলিসেই প্রথম উপলদ্ধি করি।
আল্লাহর অলি আলোচনা করছিলেন সুরা মারইয়ামের ১৫ নম্বর আয়াতের ‘ইয়ামুতু’ শব্দ নিয়ে। আয়াতের অর্থ হলো, ‘ইয়াহইয়ার ওপর শান্তি বর্ষিত হয়েছে যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, তার ওপর শান্তি বর্ষিত হবে যেদিন সে মারা যাবে এবং যেদিন তাকে কবর থেকে ওঠানো হবে।’
ইয়াহইয়া নবীর বাবা ছিলেন জলিলে কদর নবী জাকারিয়া (আ.)। তিনি ১১০ বছর বয়সে আল্লাহর কাছে নবুয়তের উত্তরসূরির জন্য দোয়া করেছেন। তখন তার স্ত্রীর বয়স ছিল ৯২ বছর। তিনি ছিলেন বন্ধ্যা। আল্লাহ জাকারিয়া নবীর দোয়া কবুল করলেন এবং বৃদ্ধ বয়সে তাকে সন্তান দিলেন। সন্তানের নাম রাখলেন ইয়াহইয়া।
ইয়াহইয়া অর্থ জীবিত। তিনি তার মায়ের রেহমকে জীবিত করেছেন এ কারণে তার নাম ইয়াহইয়া রাখা হয়েছে। ইয়াহইয়া নবীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ‘হানানা’ বা কোমলতা। তাফসিরে লেখে, সন্তানের জন্য মায়ের হৃদয়ে যে দরদ থাকে, প্রতিটি মানুষের জন্য ইয়াহইয়া নবীর হৃদয়ে সে দরদ ছিল। তিনি অন্যের দুঃখ নিজের মতো করে উপলব্ধি করার মোজেজা পেয়েছিলেন। আর তিনি ছিলেন বাবা-মার বাধ্য সন্তান। এসব গুণ উল্লেখ শেষে আল্লাহ বলেন, ‘তার ওপর শান্তি বর্ষিত হয়েছে যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে, শান্তি যেদিন সে মারা যাবে এবং যেদিন তাকে কবর থেকে ওঠানো হবে।’ কোরআনের শব্দচয়ন কতটা প্রজ্ঞাপূর্ণ তার উদাহরণ পাওয়া যায় এখানে।
আয়াতের সরল ব্যাখ্যা হলো, জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যুর পর জান্নাতে পৌঁছা পর্যন্ত তিনি শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে থাকবেন। এটা সম্ভব হয়েছে বাবার দোয়া, নিজের আমল এবং আল্লাহর রহমতের মাধ্যমে। আয়াতের সূক্ষ্ম একটি ব্যাখ্যা করেছেন ভাষা গবেষকরা। তাদের মতে আয়াতে ‘যেদিন সে জন্মগ্রহণ করেছে’ এটা বোঝানোর জন্য ‘উলিদা’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে। আবার ‘যেদিন তাকে পুনরুত্থিত করা হবে’ এটা বোঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছে ‘ইউবআছু’ শব্দটি। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী এ দুটি শব্দই ফেলে মাজহুল বা কর্মবাচ্য ক্রিয়ার রূপ। ইংরেজিতে যাকে ‘প্যাসিভ ভয়েস’ বলা হয়।
তন্ময় হয়ে আলোচনা শুনছি। আর কোরআনের শব্দের গভীরে ডুবে যাচ্ছি। আল্লাহর অলি কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ইয়াহইয়া নবীর জন্মের কর্তা তিনি নন। আবার পুনরুত্থানের কর্তাও তিনি নন। জন্ম ও পুনরুত্থান এ দুটোই অন্যের সহযোগিতায় হয়ে থাকে। এটা আমাদের সবার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এ বিষয়টি খেয়াল রেখে আল্লাহ ‘উলিদা’ এবং ‘ইউবআছু’ ক্রিয়ার প্যাসিভ রূপ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু অবাক হওয়ার বিষয় হলো, মৃত্যুর ক্ষেত্রে ফেলে মারুফের সিগাহ ব্যবহার করা হয়েছে। মারুফ হলো কর্তা নিজেই কাজটি সম্পন্ন করেন। বাংলায় একে কর্তৃবাচ্য এবং ইংরেজিতে অ্যাকটিভ ভয়েস বলা হয়। ‘ইয়ামুতু’ অর্থ যেদিন সে মারা যাবে। অর্থাৎ ইয়াহইয়া নবী নিজেই নিজের মৃত্যু রচনা করবেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, মৃত্যু তো আল্লাহর হাতে। তাহলে একজন মানুষ কীভাবে নিজের মৃত্যু নিজে রচনা করতে পারে?
আলোচনার শেষাংশে আল্লাহর ফকির মুরিদানদের উদ্দেশে বলেন, বাবারা! ইয়াহইয়া নবীর জীবনের দিকে তাকিয়ে দেখ তিনি কিন্তু বাবা-মায়ের খেদমত, মানুষের সেবা আর আল্লাহকে ভয় করে চলার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ মৃত্যু রচনা করেছেন। ঠিক আমাদেরও এখন থেকেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। তাহলে মৃত্যুটা আমাদের সহজ হবে। যে শিক্ষার্থী সারা বছর অল্প অল্প পড়াশোনা করে সিলেবাস শেষ করে তার জন্য বার্ষিক পরীক্ষা পানির মতো সহজ। কিন্তু যে বছরজুড়ে ক্লাস ফাঁকি, বাবা-মার অবাধ্য আর শিক্ষকের পরামর্শ অমান্য করে চলে পরীক্ষা তার কাছে হঠাৎ এসে পড়া বোঝার মতো মনে হয়। আল্লাহ আমাদের সুন্দর মৃত্যু এবং চমৎকার পুনরুত্থানের তাওফিক দিন।
লেখক : মাওলানা সেলিম হোসাইন আজাদী
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


