রমজান মাস শুরু হলে সাহাবায়ে কেরামের জীবনে দুনিয়াবিমুখতার প্রবণতা আরও বেড়ে যেত। তারা পার্থিব ব্যস্ততা কমিয়ে কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, নামাজ, দ্বীনি জ্ঞান অর্জন ও বিভিন্ন নফল ইবাদতে নিজেদের ব্যস্ত রাখতেন। এ ক্ষেত্রে নারী সাহাবিরাও কোনো অংশে পিছিয়ে ছিলেন না। যদিও তাঁদের আমলের বিস্তারিত বিবরণ হাদিসের গ্রন্থগুলোতে খুব বেশি পাওয়া যায় না, তবুও কিছু ঘটনার মাধ্যমে তাদের ইবাদতের চিত্র ফুটে ওঠে।

নারী সাহাবি

Advertisement

নারী সাহাবিদের মধ্যে সবার আগে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সহধর্মিণীরা। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের ইবাদতের প্রতি উৎসাহিত করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রমজানের শেষ দশক এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিশেষভাবে ইবাদতে মনোযোগী হয়ে উঠতেন। তিনি রাত জেগে ইবাদত করতেন, নিজের পরিবারকেও জাগিয়ে দিতেন এবং ইবাদতের জন্য প্রস্তুত করতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৪)

হাদিস বিশারদ আল্লামা আইনি (রহ.) বলেন, রমজানের রাতগুলোতে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর স্ত্রীদের নামাজ ও ইবাদতের জন্য ডেকে দিতেন। (উমদাতুল কারি: ১১/১৪০)

রমজান মাসে নবীজির স্ত্রীগণ তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তারা অন্য নারী সাহাবিদের নামাজ শেখানোর ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতেন। কখনো কখনো তারা জামাতে নামাজ আদায় করে অন্য নারীদের নামাজের নিয়ম শিখিয়ে দিতেন।

ইবরাহিম নাখঈ (রহ.) থেকে বর্ণিত, হজরত আয়েশা (রা.) মাঝে মাঝে নারী সাহাবিদের ইমামতি করতেন এবং তিনি তাঁদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নামাজ পরিচালনা করতেন। (কিতাবুল আসার, হাদিস: ২১৭)

হাদিস বিশারদ আল্লামা যফর আহমদ উসমানি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, আয়েশা (রা.)-এর ইমামতি মূলত নারী সাহাবিদের নামাজ শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল। (ইলাউস সুনান ৩/১৩০১)

কোরআন তিলাওয়াত প্রতিটি মুমিনের জন্য সব সময়ের আমল হলেও রমজান মাসে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন এবং পরবর্তী যুগের আলেম ও বুযুর্গরা রমজানে কোরআন তিলাওয়াতে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

অনেকেই দিনের বেলা কোরআন দেখে তিলাওয়াত করতেন এবং রাতে তারাবি ও নফল নামাজে তিলাওয়াত করতেন। এভাবেই তাদের রমজানের দিন ও রাত কোরআনের সান্নিধ্যে কাটত। নারী সাহাবিদের মধ্যেও অনেকে ছিলেন যারা প্রতিদিন একটি করে খতম সম্পন্ন করতেন। কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে এক ধরনের ইতিবাচক প্রতিযোগিতা দেখা যেত।

তারাবির নামাজ

ইসলামী শরিয়তের বিধান অনুযায়ী নারীদের জন্য তারাবি ও অন্যান্য নামাজ ঘরে একাকী আদায় করাই উত্তম। (আল বাহরুর রায়েক: ১/৬২৭, রদ্দুল মুহতার: ২/৪৬)

বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) নারীদের মসজিদের পরিবর্তে ঘরে নামাজ পড়তে উৎসাহিত করেছেন। এক নারী সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বলেছিলেন, তিনি নবীজির পেছনে নামাজ পড়তে আগ্রহী। তখন রাসুল (সা.) তাকে বলেন, মসজিদে এসে তাঁর পেছনে নামাজ পড়ার চেয়ে ঘরে একা নামাজ আদায় করা তার জন্য অধিক উত্তম।

এই কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরাম, বিশেষ করে হজরত ওমর (রা.) ও আয়েশা (রা.), নারীদের মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায়ে নিরুৎসাহিত করেছেন। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মুসলিম আলেমরাও একই মত অনুসরণ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৬৯; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২৭০৯০)

রমজানের ইতিকাফ

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর স্ত্রীগণও ইতিকাফ করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০২৬)

মাসআলা হলো, নারীদের নামাজের স্থান মূলত তাদের ঘরের ভেতর। তবে তারা ঘরেই ইতিকাফ করলে সওয়াবের দিক থেকে তা অনেক ফজিলতপূর্ণ। পুরুষদের জন্য মসজিদে ইতিকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা হলেও নারীদের জন্য তা আবশ্যক নয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৩৩; উমদাতুল কারি: ১১/১৪৮)

আরেক বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, রমজানের শেষ দশকে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফ করতেন। আমি তাঁর জন্য একটি তাঁবু তৈরি করে দিতাম। তিনি ফজরের নামাজ শেষে সেখানে প্রবেশ করতেন। পরে হাফসা (রা.) ও যয়নাব বিনতে জাহশ (রা.)-ও নিজেদের জন্য তাঁবু স্থাপন করেন। নবীজি তা দেখে জানতে চান বিষয়টি কী। পরে তিনি সেই বছর ইতিকাফ স্থগিত করেন এবং শাওয়াল মাসে দশ দিন ইতিকাফের কাজা আদায় করেন। (বুখারি, হাদিস: ২০৩৩)

রমজানে ওমরাহ

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক আনসারি মহিলাকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন তিনি হজে অংশ নিতে পারেননি। মহিলা জানান, তাদের একমাত্র উটে তার স্বামী ও ছেলে হজে চলে গেছেন। তখন রাসুল (সা.) তাকে বলেন, রমজান মাস এলে ওমরাহ আদায় করো। কারণ রমজানে একটি ওমরাহ একটি হজের সমতুল্য সওয়াবের অধিকারী। (বুখারি, হাদিস: ১৭৮২)

শিশুদের রোজায় অভ্যস্ত করা

রুবাইয়্যি বিনতে মুআব্বিয (রা.) বলেন, আশুরার দিনে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দেন, যারা সওম পালন করেনি তারা যেন দিনের বাকি সময় না খায় এবং যারা রোজা রেখেছে তারা যেন তা পূর্ণ করে। তিনি বলেন, আমরা নিজেরাও রোজা রাখতাম এবং শিশুদেরও রোজায় অভ্যস্ত করতাম। তাদের জন্য পশমের খেলনা বানিয়ে দিতাম, যাতে তারা খাবারের জন্য কাঁদলে খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখা যায়। (বুখারি, হাদিস: ১৯৬০)

স্বামীর সেবা

হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি ঋতুমতী অবস্থায়ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর চুল আঁচড়িয়ে দিতেন। তখন নবীজি মসজিদে ইতিকাফে থাকতেন এবং আয়েশা (রা.) তাঁর ঘরে অবস্থান করতেন। নবীজি তাঁর মাথা আয়েশা (রা.)-এর দিকে বাড়িয়ে দিতেন। (বুখারি, হাদিস: ২০৪৬)

দানশীলতা

উরওয়া ইবনে যুবাইর (রা.) বলেন, মুয়াবিয়া (রা.) একবার হজরত আয়েশা (রা.)-এর কাছে এক লাখ দিরহাম পাঠান। তখন তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন। তিনি পুরো অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বিতরণ করে দেন। শেষে তাঁর দাসী বারিরাহ (রা.) বলেন, আপনি তো রোজা রেখেছেন, অন্তত একটি দিরহাম রেখে কিছু খাবার কিনতে পারতেন। তখন আয়েশা (রা.) বলেন, বিষয়টি আমার মনে ছিল না। (মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদিস: ৬৭৪৫)

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.