দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কাটিয়ে একটি ঐতিহাসিক চুক্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশ একটি ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সই করতে যাচ্ছে।

এই চুক্তির আওতায় বিতর্কিত হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করা হবে, ইরান আন্তর্জাতিক বাজারে অবাধে তেল বিক্রির সুযোগ পাবে এবং বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে।
এই সম্ভাব্য চুক্তিটি বৈশ্বিক রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ বাড়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে জ্বালানির চাপ অনেকটাই কমে আসবে। তবে এই সাময়িক চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের কঠোর পারমাণবিক শর্ত পূরণ করে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ নেবে কি না, তা নিয়ে এখনো কিছুটা অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে, চুক্তিটি রোববারের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং শেষ মুহূর্তে যেকোনো পক্ষ পিছিয়ে গেলে তা ভেস্তেও যেতে পারে। ইরান সরকার এখনো এই খসড়ার বিস্তারিত নিশ্চিত না করলেও, তেহরানও ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা একটি চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে।
চুক্তিতে যা যা থাকছে: খসড়া অনুযায়ী, দুই দেশ প্রথমে ৬০ দিনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করবে, যা পরবর্তীতে উভয়ের সম্মতিতে বাড়ানো যেতে পারে। এই ৬০ দিন সময়ে হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ টোল-মুক্ত বা শুল্কহীনভাবে খোলা থাকবে। এই জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে ও অবাধে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য ইরান সেখানে তাদের পেতে রাখা সব সামুদ্রিক মাইন অপসারণ করতে রাজি হয়েছে। এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের অবরোধ তুলে নেবে এবং ইরানের তেল বিক্রির ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করবে।
মার্কিন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, তেল বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের চাঙ্গা হবে, তবে এটি একই সাথে বিশ্ব তেলের বাজারেও বড় স্বস্তি দেবে। ট্রাম্পের স্পষ্ট নীতি হলো, কাজের বিনিময়ে ছাড়। অর্থাৎ, ইরান যত দ্রুত মাইন অপসারণ করে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করবে, মার্কিন অবরোধও তত দ্রুত তুলে নেয়া হবে। ইরান অবশ্য শুরুতেই তাদের ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ থাকা তহবিল অবমুক্ত করার এবং স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছিল, কিন্তু মার্কিন পক্ষ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, আগে ইরানকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবসম্মত ছাড় দিতে হবে, তারপরই কেবল তা বিবেচনা করা হবে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা: সমঝোতা স্মারকের খসড়ায় ইরানের পক্ষ থেকে দুটি বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখা ও উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করবে।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরান ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে এই বিষয়ে মৌখিক প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। ৬০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে স্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আটকে থাকা তহবিল ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছে।
তবে এই পদক্ষেপগুলো তখনই কার্যকর করা হবে, যখন একটি চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং ইরান তা বাস্তবে মেনে চলছে কি না, তা যাচাই করা সম্ভব হবে। এছাড়া, সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা অতিরিক্ত মার্কিন সেনা এই ৬০ দিন অঞ্চলেই অবস্থান করবে এবং চূড়ান্ত চুক্তি হলেই কেবল তারা ফিরে যাবে।
ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ প্রসঙ্গ: এই চুক্তির একটি বড় চমক হলো, এর আওতায় লেবাননে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার চলমান যুদ্ধও অবসান ঘটবে। তবে এই শর্তটি নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। শনিবার ট্রাম্পের সাথে এক ফোনালাপে তিনি চুক্তির এই দিকটি এবং অন্যান্য কিছু বিষয়ে তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু অত্যন্ত সম্মান ও আনুগত্য বজায় রেখেই তাঁর বক্তব্য তুলে ধরেছেন। মার্কিন পক্ষ স্পষ্ট করেছে যে এটি কোনো একপাক্ষিক যুদ্ধবিরতি হবে না। হিজবুল্লাহ যদি পুনরায় অস্ত্র সজ্জা বা নতুন করে হামলা চালানোর চেষ্টা করে, তবে ইসরায়েলকে তা প্রতিহত করার পূর্ণ অধিকার দেওয়া হবে। সহজ কথায়, হিজবুল্লাহ শান্ত থাকলে, ইসরা্লও শান্ত থাকবে।
মার্কিন কর্মকর্তা আরও মন্তব্য করেন, নেতানিয়াহুর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, কিন্তু ট্রাম্পকে পুরো যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থের কথা চিন্তা করতে হচ্ছে।
যেভাবে সম্ভব হলো এই চুক্তি: এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ পর্দার আড়ালের প্রচেষ্টা। শনিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ কয়েকজন আরব ও মুসলিম দেশের নেতাদের সাথে একটি কনফারেন্স কলে কথা বলেন এবং তাঁরা সবাই এই চুক্তিকে সমর্থন জানান। এই নেতাদের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদও ছিলেন।
এছাড়া সৌদি আরব, কাতার, মিশর, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতারা এই কলে অংশ নেন, যাঁরা শুরু থেকেই মধ্যস্থতার চেষ্টায় যুক্ত ছিলেন। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। দেশটির ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির গত শুক্র ও শনিবার নিজে তেহরানে অবস্থান করে চুক্তিটি চূড়ান্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য গত কয়েকদিন ধরে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন—তিনি ইরানের ওপর বড় ধরনের সামরিক হামলা চালাবেন, নাকি কূটনীতির পথে হাঁটবেন। তবে শনিবার সন্ধ্যা নাগাদ তিনি কূটনৈতিক সমাধানের দিকেই চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়েন। হোয়াইট হাউস আশা করছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছোটখাটো মতবিরোধগুলো দূর করে আজই চুক্তির ঘোষণা আসবে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে ইরান পারমাণবিক আলোচনা নিয়ে নাটক করছে, তবে এই চুক্তি ৬০ দিনও টিকবে না। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসন বিশ্বাস করে, বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরান নিজেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের আটকে থাকা নগদ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করতে আগ্রহী হবে। ট্রাম্পের উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, ইরান যদি পারমাণবিক শর্তগুলো মেনে চলে, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সাথে সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে এবং দেশটির বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বড় ধরনের সহযোগিতা করতেও প্রস্তুত আছেন।
তথসূত্র: অ্যাক্সিওস
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



