জাহিদ ইকবাল : রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় একজন গাড়িচালককে চাঁদা লেনদেনকে কেন্দ্র করে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা আমাদের সামনে চাঁদাবাজির প্রকৃত শক্তির একটি বড় চিত্র উন্মোচন করেছে। এটি কোনো ব্যক্তিগত দুর্বৃত্ততার বিষয় নয়; বরং সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল একটি কাঠামোগত সমস্যা।

চাঁদাবাজদের ক্ষমতা কেবল ব্যক্তিগত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভয়, দায়মুক্তি, রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং অর্থনৈতিক সুবিধা এর সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত।
চাঁদাবাজির শক্তির সবচেয়ে বড় উৎস হলো ভয়। তারা তাদের লক্ষ্যবস্তুদের ওপর নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলে হুমকি, জবরদস্তি এবং শারীরিক সহিংসতার মাধ্যমে। সাধারণ মানুষ জানে, প্রতিবাদ করলে শারীরিক ক্ষতি বা আইনগত জটিলতার সম্মুখীন হতে হবে। এই ভয়ই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
দ্বিতীয় শক্তির উৎস হলো দায়মুক্তির সংস্কৃতি। প্রশাসন বা আইন প্রয়োগে অবহেলার কারণে অনেক চাঁদাবাজ প্রতিনিয়ত অপরাধ চালাতে পারে, যদিও তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণও থাকে। দায়মুক্তি তাদের কার্যক্রমকে দীর্ঘস্থায়ী এবং ঝুঁকিমুক্ত করে তোলে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া চাঁদাবাজদের ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে। নির্বাচনী প্রচারণা, স্থানীয় কমিটি বা অনুষ্ঠানগুলোর আড়ালে অর্থ আদায় প্রায়শই বৈধতার আভাস পায়। নেতা বা দলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজরা কার্যত সামাজিক ও প্রশাসনিক দিক থেকে সুরক্ষিত থাকে।
অর্থনৈতিক সুবিধাও বড় ভূমিকা রাখে। ক্ষুদ্র দোকান, নির্মাণ প্রকল্প, পরিবহন ও ফুটপাতের ব্যবসায়—যেখানে নিয়মিত নগদ অর্থের আদায় হয়, সেখান থেকে চাঁদাবাজরা নিয়মিত আয় নিশ্চিত করে। এটি তাদের শক্তিকে দীর্ঘমেয়াদী ও বিস্তৃত করে।
সামাজিক অবহেলা এবং নীরবতাও তাদের শক্তিকে বাড়ায়। অনেক সময় সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রতিবাদ করে না। নীরবতা চাঁদাবাজদেরকে অপ্রকাশ্য বৈধতা দেয় এবং সমাজে তাদের ক্ষমতা টিকে রাখে।
প্রযুক্তি এবং তথ্যের অভাবও শক্তি বাড়ায়। নগদ লেনদেন, আড়াল লেনদেন, ডিজিটাল নজরদারির অভাব চাঁদাবাজদের সুবিধা দেয়। গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার অভাবে অপরাধী আরও সাহসী হয়।
চাঁদাবাজির শক্তি ভেঙে দিতে হলে দরকার সামাজিক ঐক্য, প্রশাসনিক কঠোরতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং স্বচ্ছতা। ব্যবসায়ী সমিতি, পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠন, নাগরিক কমিটি—সম্মিলিতভাবে অবস্থান নিলে চাঁদাবাজদের শক্তি দুর্বল হবে। ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো, স্বচ্ছ ফি-তালিকা প্রকাশ ও অভিযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ কমানো সম্ভব।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সংক্ষেপে: চাঁদাবাজের শক্তি আসে ভয় + দায়মুক্তি + রাজনৈতিক সহায়তা + অর্থনৈতিক সুবিধা + সামাজিক নীরবতা এর সমন্বয়ে। একমাত্র সম্মিলিত প্রতিরোধ, সচেতন নাগরিক সমাজ ও কার্যকর আইন প্রয়োগই এই শক্তির উৎস ভেঙে দিতে পারে।
নিরীহ মানুষের জীবন আর ঝরে পড়ুক—এটি আমরা মেনে নিতে পারি না। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করাই একমাত্র সমাধান।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


