সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জে চলতি বছর বালুমহাল ইজারাকে ঘিরে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক সক্ষমতা ও টাকার উৎস নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসনের আহ্বানে অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত দরপত্রে কয়েকটি বালুমহাল কোটি টাকায় ইজারা হলেও দরদাতাদের পরিচয় ও আর্থিক উৎস নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২৯ মার্চ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তিনটি বালুমহালের দরপত্র অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে হরিরামপুর উপজেলার লেছড়াগঞ্জ বালুমহালে উপযুক্ত দরদাতা না পাওয়ায় পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
অন্যদিকে, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহালের সরকারি মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২ কোটি ২৩ লাখ ৭৩ হাজার ৭২১ টাকা। এই বালুমহালটি ২ কোটি ২৫ লাখ টাকায় ইজারাদার হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত হযেছেন রিজু এন্টারপ্রাইজ, যার দায়িত্বে রয়েছেন মানিকগঞ্জ পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. কামাল হোসেন।
একইভাবে শিবালয় উপজেলার তেওতা বালুমহালের সরকারি মূল্য ছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫১ টাকা। এটি ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় ইজারাদার হিসেবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত হয়েছেন একরাম এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে আছেন জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক অয়ন খান।
তবে সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, তেওতা বালুমহালটি গত বছর ২ কোটি ১১ লাখ ৮ হাজার ৭৬০ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে এক বছরের ব্যবধানে প্রায় অর্ধেক মূল্যে ইজারা হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে দর নির্ধারণ প্রক্রিয়া নিয়েও।
এদিকে, মো. কামাল হোসেন গত বছর ঘিওর উপজেলার তরা বালুমহাল ৭ কোটি ৫১ লাখ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকা এবং চামটা-পৌলী-বিলবাড়িয়াবিল বালুমহাল ৩ কোটি ৪০ লাখ টাকায় ইজারা নেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ওই সময় বিপুল অর্থ জোগাড় করতে তিনি শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করেন, যা বালুমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ বছরও কম মূল্যে ইজারা পাওয়ার পেছনে প্রভাব ও যোগসাজশ থাকতে পারে। বিশেষ করে যেসব ব্যক্তি সরাসরি বড় ধরনের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন, তাদের হঠাৎ করে কোটি টাকার ইজারা নেওয়া নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ধেক মূল্যে বালুমহাল ইজারা দেয়া প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক ও বালুমহাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি নাজমুন আরা সুলতানার বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে কল দিলেও তিনি রিসিভ না করায় তার মন্তব্য জানা যায়নি। পরে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “বিগত তিন বছরের ইজারা মূল্যের গড় হিসাব করে তার থেকে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ইজারাদারদের সাব-ঠিকাদার বা শেয়ার হোল্ডার নেয়ার আইনগত কিান বিধান নেই।”
ইজারাদারদের টাকার উৎস সম্পর্কে যাচাইবাছাই সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ইজারাদারের নির্দিষ্ট লাইসেন্স এব প্রেক্ষিতে ব্যাংক সলভেন্সি এবং ট্যাক্স ফাইল জমা দিতে হয়। সেগুলো যাচাই করে ফাইনাল করা হবে।”
এ বিষয়ে ইজারাদার কামাল হোসেন বলেন, গতবছর ইজারার টাকা ১০০ শেয়ার হোল্ডারের কাছ থেকে নিয়েছি। শেয়ার হোল্ডার নেয়ার ডিডও আছে আমার কাছে। এবছরও গতবছরের ওই শেয়ার হোল্ডারদের কাছ থেকেই টাকা নেয়া হবে। সাথে কিছু নতুন শেয়ার হোল্ডার যুক্ত করা হবে। শেয়ার হোল্ডার নেয়ার বিধান আছে কি’না জানতে চাইলে তিনি মোবাইল ফোনে কথা না বলে সামনা সামনি বলবেন জানিয়ে ফোন কেটে দেন।
আরেক ঠিকাদার অয়ন খান বলেন, শেয়ার হোল্ডারদের কাছ থেকে ইজারার টাকা নেয়া হবে। ইজারার লাইসেন্সটা শুধু আমার নামে, বাকি সব শেয়ার হোল্ডারদের। ১০ জন শেয়ার হোল্ডার নেয়া হলে প্রতিটি শেয়ারমূল্য হবে ২০ লাখ টাকা এবং ২০ জন নেয়া হলে শেয়ারমূল্য হবে ১০ লাখ টাকা। আর পে-অর্ডারের টাকাটাও একজন শেয়ার হোল্ডারের একাউন্ট থেকে পে-অর্ডার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, বৈধ টাকায় বালুমহাল ইজারা নিয়ে থাকলে এ বিষয়ে আমার কোন মন্তব্য নেই। তবে কেউ যদি সংগঠনবিরোধী কোন কাজ করে বা আইনের ব্যতয় ঘটিয়ে কোন ধরনের অপকর্ম করে থাকে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলার সিনিয়র সহ-সভাপিত ইকবাল হোসেন কচি বলেন, বালুমহাল ইজারার ক্ষেত্রে দরদাতার আর্থিক সক্ষমতা ও অর্থের উৎস যাচাই করা জরুরি। তা না হলে অবৈধ অর্থের প্রবাহ বাড়ার ঝুঁকি থাকে। ধারণা করা হচ্ছে- যারা ইজারা নিয়েছে তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, আর যারা ইজারা দিয়েছে তারাও সঠিক জায়গায় থাকতে পারেনি।”
জেলা জুড়ে এখন প্রশ্ন—কিভাবে বড় ধরনের দৃশ্যমান ব্যবসা ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোটি টাকার ইজারা নিচ্ছেন? এ বিষয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


