আর্জেন্টিনা জিতছে, সমর্থকদের মুখে হাসিও ফুটছে। তবে প্রতিটি ম্যাচ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত যেন বুক ধড়ফড় করতে থাকে ভক্তদের। কাতার বিশ্বকাপের সেই পরিচিত দৃশ্য যেন আবারও ফিরে এসেছে। ফলাফল আলবিসেলেস্তেদের পক্ষেই যাচ্ছে, কিন্তু তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও সহজ জয় নিশ্চিত করতে পারছে না তারা। বরং এগিয়ে গিয়েও বারবার প্রতিপক্ষকে ম্যাচে ফেরার সুযোগ করে দিচ্ছে।

কেপ ভার্দের বিপক্ষে সাম্প্রতিক ম্যাচটিও সেই চিত্রেরই আরেকটি উদাহরণ। তাহলে আর্জেন্টিনার আসল সমস্যা কোথায়? কেন তারা নিজেরাই ম্যাচকে কঠিন করে তুলছে? চলুন বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।
লিড নেওয়ার পরই ছন্দ হারায় আর্জেন্টিনা
বর্তমান আর্জেন্টিনা দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ম্যাচের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। গোল করে এগিয়ে যাওয়ার পর দলটি যেন অযথা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়ে। খেলার গতি কমিয়ে দেয়, চাপ কমায় এবং প্রতিপক্ষকে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার সুযোগ দেয়।
ফলে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষের দিকে চলে যায়।
পুরোনো সমস্যাই কি আবার ফিরে এসেছে?
এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। কাতার বিশ্বকাপেও একই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।
- সৌদি আরবের বিপক্ষে এগিয়ে থেকেও হার।
- নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ২-০ লিড হারিয়ে টাইব্রেকারে যেতে হয়।
- ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে দুই গোলের ব্যবধান ধরে রাখতে পারেনি।
- অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও সহজ ম্যাচ শেষ মুহূর্তে কঠিন হয়ে ওঠে।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথেও প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই অপ্রয়োজনীয় চাপের মুখে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের বিপক্ষেও সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি দেখা গেল।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে কী ঘটেছিল?
এই ম্যাচে আর্জেন্টিনা তিনবার এগিয়ে যায়।
প্রথমবার লিড নেওয়ার পর কেপ ভার্দে সমতা ফেরায়। দ্বিতীয়বারও একই ঘটনা ঘটে। তৃতীয়বার এগিয়ে যাওয়ার পরও প্রতিপক্ষ সমতা ফেরানোর খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
শেষ পর্যন্ত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেসের দুর্দান্ত একটি সেভ আর্জেন্টিনাকে জয় এনে দেয়।
ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, অনেকে ম্যাচটিকে সহজ ভাবলেও তারা কখনোই এমনটা মনে করেননি। পুরো ম্যাচেই দলকে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
কেন এমন হচ্ছে?
শক্তি বাঁচানোর কৌশলই কি কাল হচ্ছে?
নকআউট পর্বে অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ম্যাচ খেলতে হয়। তাই আর্জেন্টিনা শুরু থেকেই পুরো শক্তি ব্যয় করতে চায় না। একবার এগিয়ে গেলে তারা ম্যাচের গতি কমিয়ে শক্তি সংরক্ষণের চেষ্টা করে।
কিন্তু এই পরিকল্পনাই অনেক সময় উল্টো ফল দিচ্ছে। কারণ গতি কমিয়ে দেওয়ার সুযোগে প্রতিপক্ষ ম্যাচে ফিরে আসে। ফলে শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় বা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে হয়, যা আরও বেশি শারীরিক শক্তি ক্ষয় করে।
শুধুই কি ক্লান্তির প্রভাব?
স্কালোনি বিশ্রামের স্বল্পতার বিষয়টি উল্লেখ করলেও কেপ ভার্দের ম্যাচের আগে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে আর্জেন্টিনার মূল একাদশ বিশ্রামে ছিল।
তাই শুধুমাত্র ক্লান্তিকে এই সমস্যার একমাত্র কারণ বলা কঠিন।
রক্ষণাত্মক কৌশলও বড় কারণ
আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচজুড়ে হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলে না। তারা নির্দিষ্ট সময়ে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে আক্রমণে যায়।
কেপ ভার্দের বিপক্ষে মেসির প্রথম গোলও এমন এক দ্রুতগতির আক্রমণ থেকেই আসে।
তবে গোল করার পরই আর্জেন্টিনা অনেক নিচে নেমে যায় এবং প্রতিপক্ষকে বলের দখল ছেড়ে দেয়। দীর্ঘ সময় নিজেদের অর্ধে রক্ষণ করতে গিয়ে ছোট ছোট ভুল তৈরি হয়, যার সুযোগ কাজে লাগায় প্রতিপক্ষ।
কেপ ভার্দের প্রথম গোল আসে এমনই একটি রক্ষণভাগের ভুল থেকে, আর দ্বিতীয় গোলটি ছিল দূরপাল্লার দুর্দান্ত শট।
মেসির বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে সমস্যার চিত্র
ম্যাচ শেষে অধিনায়ক লিওনেল মেসিও দলের কৌশলগত দুর্বলতার কথা স্বীকার করেন।
তার মতে, আর্জেন্টিনা ঠিকভাবে প্রেসিং করতে পারেনি। মিডফিল্ড ও ডিফেন্স লাইনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় কেপ ভার্দে অতিরিক্ত একজন খেলোয়াড়ের সুবিধা পাচ্ছিল এবং সহজেই বলের দখল ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছিল।
মেসির এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, সমস্যাটি শুধু ব্যক্তিগত ভুল নয়, বরং দলগত সমন্বয়ের ঘাটতি।
কাউন্টার অ্যাটাকে সীমাবদ্ধতা
আর্জেন্টিনার আরেকটি দুর্বলতা হলো দ্রুত কাউন্টার অ্যাটাক করতে না পারা।
প্রতিপক্ষ আক্রমণে উঠে এলে তাদের রক্ষণে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। কিন্তু আর্জেন্টিনা সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না।
এর অন্যতম কারণ, বর্তমান উইঙ্গাররা গতি নির্ভর ফুটবলার নন। তারা ছোট ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ গড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
অন্যদিকে, লিওনেল মেসিও এখন আর আগের মতো দীর্ঘ দূরত্বে একাই বল নিয়ে দ্রুতগতির কাউন্টার অ্যাটাক পরিচালনা করতে পারেন না। ফলে স্ট্রাইকারদেরও রক্ষণে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং আক্রমণে লোকসংখ্যা কমে যায়।
তবুও কেন আর্জেন্টিনা এখনো ভয়ংকর?
দুর্বলতা থাকলেও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের মানসিক দৃঢ়তা।
কেপ ভার্দে দুইবার সমতা ফেরানোর পরও দলটি ভেঙে পড়েনি। ধৈর্য ধরে বলের দখল ধরে রেখেছে, সুযোগ তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সেট-পিস থেকে দুই সেন্টার-ব্যাকের গোলে জয় নিশ্চিত করেছে।
ম্যাচ কঠিন হয়ে গেলেও জয়ের পথ খুঁজে বের করার মানসিকতা এখনো আর্জেন্টিনার অন্যতম বড় শক্তি।
স্কালোনিও বলেছেন, কাতার বিশ্বকাপের অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচগুলোর কথা তার মনে পড়ছিল। তবে এবার তিনি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছেন। আগের মতো দল মানসিকভাবে ভেঙে পড়েনি। বরং অভিজ্ঞতার কারণে কঠিন পরিস্থিতিতেও শান্ত থেকে ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
আর্জেন্টিনা নিঃসন্দেহে প্রতিভাবান একটি দল। তবে ম্যাচকে সহজভাবে শেষ করার পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কঠিন করে তোলার প্রবণতা তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়।
নকআউট পর্বে সামনে আরও শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অপেক্ষা করছে। সেখানে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে বড় মূল্য দিতে হতে পারে স্কালোনির দলকে।
এখন দেখার বিষয়, আর্জেন্টিনা কি তাদের এই পুরোনো দুর্বলতা কাটিয়ে ম্যাচের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, নাকি প্রতিটি ম্যাচেই শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত সমর্থকদের হৃদস্পন্দন বাড়িয়ে রাখবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



