পাহাড়, সমুদ্র আর সবুজ প্রকৃতি দিয়ে সাজানো দেশের প্রধান বিনোদনকেন্দ্র কক্সবাজার। ঈদুল আজহার ছুটিতে যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে কিছুটা প্রশান্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য কক্সবাজার হতে পারে মনের মতো আদর্শ গন্তব্য।

একটু অবসরে দূরে কোথাও ঘুরে বেড়ানোর কথা মনে হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল জলরাশি আর বালুকাময় সমুদ্রসৈকত।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত ভালো লাগে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। তাই কর্মব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি দূর করতে মানুষ বরাবরই ছুটে আসেন পর্যটন নগরী কক্সবাজারে। তবে বেশির ভাগ পর্যটক শুধু সমুদ্রসৈকত ঘুরেই ফিরে যান। অথচ সৈকতের বাইরেও কক্সবাজারে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান, যেগুলোর অনেকগুলোই এখনো অনেকের অজানা।
শাহপরীর দ্বীপ:
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে অবস্থিত শাহপরীর দ্বীপ। টেকনাফ শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার। এখান থেকে সমুদ্রকে তিন ভাগে উপভোগ করা যায়। রয়েছে দীর্ঘ জেটি, যেখানে দাঁড়িয়ে খুব সহজেই উপভোগ করা যায় সমুদ্র আর চারপাশের অপরূপ দৃশ্য। এই দ্বীপ থেকে দেখা যায় মিয়ানমারের মংডু অঞ্চল, সেখানকার পাহাড় এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপও। এখানে নতুন সংযোজন হয়েছে ৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়ক। সেটি দেখতে পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে।
যেভাবে যাওয়া যায়-
ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে টেকনাফ যাওয়া যায়। আবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে সেখান থেকে বাস, কার, চাঁদের গাড়ি (ট্যুরিস্ট জিপ) অথবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় শাহপরীর দ্বীপে যাওয়া যায়।
এছাড়া সাবরাং এলাকায় নির্মাণাধীন ‘সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক’ দেখতে পর্যটকরা ছুটে যান। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিদিন দেশি-বিদেশি প্রায় ৩৯ হাজার পর্যটক সেখানে সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। বর্তমানে চলমান কাজ দেখতে পর্যটকদের ভিড় থাকে সাবরাং জিরো পয়েন্টে।
জাহাজপুরা গর্জন ফরেস্ট:
কক্সবাজার শহর থেকে মেরিন ড্রাইভ সড়ক ধরে ৫৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী গর্জন বৃক্ষ। এই বাগানে রয়েছে ৫ হাজার ৭৭২টিরও বেশি গর্জন গাছ। একেকটি গাছের উচ্চতা ৭০ থেকে ৮০ ফুট এবং বেড় ১০ থেকে ১২ ফুট। শতবর্ষী এসব গাছ আর সবুজ অরণ্যে গড়ে ওঠা পরিবেশ দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন পর্যটকরা।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার থেকে রিজার্ভ গাড়িতে ৪ হাজার টাকার মধ্যে জাহাজপুরা যাওয়া যায়। লোকাল পরিবহনে যেতে চাইলে কক্সবাজার থেকে শামলাপুর পর্যন্ত জনপ্রতি ১৫০-২০০ টাকা এবং শামলাপুর থেকে ২০-৩০ টাকা ভাড়ায় জাহাজপুরা গর্জন ফরেস্ট ঘুরে আসা যায়।
স্বপ্নতরী পার্ক:
কক্সবাজারের রামুতে অবস্থিত প্রায় পাঁচ হাজার বর্গফুটের স্বপ্নতরী পার্ক নতুন বিনোদন স্পট হিসেবে নজর কেড়েছে। প্রায় ৩ একর জায়গাজুড়ে গড়ে ওঠা পার্কটিতে দিন দিন বাড়ছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের ভিড়।
রামু উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তরে কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পূর্ব পাশে রশিদনগর গুচ্ছগ্রামসংলগ্ন পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত পার্কটি। স্বপ্নতরী জাহাজকে ঘিরে নান্দনিকভাবে সাজানো হয়েছে পুরো এলাকা। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের জন্য রয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী বিনোদনের ব্যবস্থা।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার শহর অথবা রামু স্টেশন থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ৩০০-৩৫০ টাকার মধ্যে পার্কটিতে যাওয়া যায়।
নিভৃতে নিসর্গ পার্ক:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় পর্যটকদের নতুন আকর্ষণের নাম ‘নিভৃতে নিসর্গ পার্ক’। এটি চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। মাতামুহুরী নদী ও পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রায় ১০০ একর জায়গাজুড়ে গড়ে উঠেছে এই পার্ক।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন পর্যটকরা ছুটে আসছেন এখানে। পাহাড়ের মাঝখানে মাটি কেটে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি লেক। সেখানে রয়েছে ছোট ছোট নৌকা ও কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা। নীল জলের লেকে নৌকায় ভেসে দেখতে পাওয়া যায় সাদা পাথরের পাহাড়। শ্বেতপাথরে যাওয়ার জন্যও রাখা হয়েছে সারি সারি নৌকা।
যেভাবে যাওয়া যায়-
ঢাকা থেকে আসা পর্যটকরা কক্সবাজার শহরে না গিয়ে চকরিয়া বাসস্ট্যান্ডে নামতে পারেন। সেখান থেকে সিএনজি বা জীপ রিজার্ভ করে সরাসরি পার্কে যাওয়া যায়। এছাড়া লোকাল পথে মানিকপুর হয়ে ৫০ টাকা ভাড়ায়ও যাওয়া সম্ভব। চকরিয়ায় রাত্রিযাপনের জন্য রয়েছে আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থা।
ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রতিষ্ঠিত ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পার্কটি বাংলাদেশের প্রথম সাফারি পার্ক। এখানে পশুপাখি মুক্ত পরিবেশে বিচরণ করে। তাই প্রতিবছর হাজার হাজার পর্যটক ভিড় করেন এই পার্কে।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার থেকে সরাসরি সাফারি পার্কে যাওয়া যায়। জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৫০ টাকা। রিজার্ভ গাড়িতে গেলে খরচ হতে পারে ২০০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
রামু বৌদ্ধ বিহার:
রামু বৌদ্ধ বিহার কক্সবাজার জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনা। পুরাকীর্তিসমৃদ্ধ রামুতে রয়েছে ৩৫টিরও বেশি বৌদ্ধ মন্দির ও জাদি। রামুর উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ায় রয়েছে গৌতম বুদ্ধের ১০০ ফুট দীর্ঘ সিংহশয্যা মূর্তি। অদূরেই নতুনভাবে নির্মিত হয়েছে কেন্দ্রীয় সীমাবিহার। এছাড়া, নজরকাড়া লালচিং ও সাদাচিং বৌদ্ধ বিহারও রয়েছে এখানে।
উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে উত্তর মিঠাছড়ি ১০০ ফুট বৌদ্ধ মূর্তি, রামু সীমা বিহার, লামারপাড়া বৌদ্ধ বিহার, রাংকূট বৌদ্ধ বিহার, শ্রী শ্রী রামকুট তীর্থধাম ও শ্রীকুল পুরাতন বৌদ্ধ বিহার। পাশাপাশি রামুর রাবার বাগানও পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার শহর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় জনপ্রতি ৪০ টাকা ভাড়ায় রামু যাওয়া যায়। রিজার্ভ নিলে খরচ হবে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ৪-৫ ঘণ্টা সময় নিয়ে ঘুরলে বেশ কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার দেখা সম্ভব।
আদিনাথ মন্দির:
মহেশখালীর গোরকঘাটার মৈনাক পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত আদিনাথ মন্দির। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তীর্থস্থান। মহাদেবের নামানুসারে মন্দিরটির নামকরণ করা হয়েছে। মন্দির কমপ্লেক্সের ভেতরে রয়েছে রাখাইন বৌদ্ধ বিহার ও মসজিদও। এ কারণে অনেকে এটিকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসে শিব চতুর্দশী উপলক্ষে এখানে ১০-১৫ দিনব্যাপী মেলা বসে।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার শহর থেকে অটোরিকশা বা সিএনজিতে কস্তুরাঘাট বা ৬ নম্বর জেটি ঘাটে যেতে হবে। সেখান থেকে জনপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়ায় স্পিডবোটে মহেশখালী যাওয়া যায়। রিজার্ভ নিলে খরচ প্রায় ১০০০ টাকা।
সোনাদিয়া দ্বীপ:
কক্সবাজারের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান সোনাদিয়া দ্বীপ। ম্যানগ্রোভ বন ও উপকূলীয় সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই দ্বীপটি মহেশখালী উপজেলার অন্তর্গত। তিনদিকে নীল সাগর, লাল কাঁকড়া, কেয়াবন আর অতিথি পাখির সমাহারে সোনাদিয়া দ্বীপ যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। সূর্যাস্ত উপভোগ ও চাঁদনি রাতে ক্যাম্পিংয়ের জন্য এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। শীত মৌসুমে হাজার হাজার জেলে এখানে মাছ শুকিয়ে শুটকি তৈরি করেন। ফলে এটি দেশের অন্যতম শুটকি উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার কস্তুরাঘাট থেকে স্পিডবোট বা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সোনাদিয়া যাওয়া যায়। স্পিডবোট রিজার্ভে ভাড়া পড়ে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। মহেশখালী হয়ে যেতে চাইলে প্রথমে জনপ্রতি ৭৫ টাকা ভাড়ায় মহেশখালী যেতে হবে। এরপর গোরকঘাটা হয়ে ঘটিভাঙ্গা পৌঁছে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় সোনাদিয়া চ্যানেল পার হতে হয়।
মেরিন ড্রাইভ:
কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ দেশের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন সড়ক। ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক বঙ্গোপসাগরের পাশ দিয়ে কলাতলী সৈকত থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৭ সালের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন। সড়কের এক পাশে বিশাল সমুদ্র, অন্য পাশে সবুজ পাহাড়। এই অনন্য সৌন্দর্যের কারণে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ এখন মেরিন ড্রাইভ।
যেভাবে যাওয়া যায়-
যেকোনো যানবাহনে ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে পুরো মেরিন ড্রাইভ ঘুরে দেখা যায়। রিজার্ভ গাড়িতে ঘুরতে খরচ হতে পারে প্রায় ৬ হাজার টাকা। লোকাল পরিবহনে কক্সবাজার থেকে সাবরাং যেতে জনপ্রতি প্রায় ৩০০-৩৫০ টাকা লাগতে পারে।
টেকনাফ জেটি:
টেকনাফ শহরের পূর্ব পাশে নাফ নদীর তীরে অবস্থিত টেকনাফ জেটি। এখান থেকে খুব কাছ থেকে দেখা যায় মিয়ানমার। এমনকি সেখানকার পাহাড়-পর্বত ও মানুষের চলাচলও চোখে পড়ে। টেকনাফ ভ্রমণে গেলে পর্যটকরা সাধারণত এই জেটিতেও ঘুরে আসেন।
মাথিনের কূপ:
টেকনাফ থানা চত্বরে নাফ নদীর কোল ঘেঁষে অবস্থিত ঐতিহাসিক মাথিনের কূপ। আঠারো শতকের শেষ দিকে পানির সংকট মেটাতে এখানে তৈরি করা হয়েছিল সুপেয় পানির কূপ। এই কূপকে ঘিরেই গড়ে ওঠে পুলিশ কর্মকর্তা ধীরাজ ভট্টাচার্য ও রাখাইন তরুণী মাথিনের প্রেমকাহিনি। ধীরাজ কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনাহার ও অনিদ্রায় মৃত্যুবরণ করেন মাথিন। সেই প্রেমের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবেই সংরক্ষণ করা হয়েছে মাথিনের কূপ। বর্তমানে এখানে রয়েছে ধীরাজের ভাস্কর্য ও প্রেমকাহিনির দেয়ালিকা, যা দেখতে পর্যটকদের ভিড় জমে।
যেভাবে যাওয়া যায়-
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ শহরের থানার সামনে গেলেই মাথিনের কূপ দেখা যাবে। বিভিন্ন যানবাহনে জনপ্রতি ভাড়া ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। রিজার্ভ গাড়িতে গেলে খরচ হবে ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
টেকনাফ ন্যাচার পার্ক:
টেকনাফ উপজেলার হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকায় অবস্থিত ‘টেকনাফ ন্যাচার পার্ক’। টেকনাফ শহর থেকে ৯ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত এই শতবর্ষী পার্কে রয়েছে সবুজ পাহাড়ি পরিবেশের অপার সৌন্দর্য। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক এখানে ভিড় করেন।
যেভাবে যাওয়া যায়-
টেকনাফ শহর থেকে সিএনজি চালিত অটোরিকশায় ২৫০ টাকার মধ্যে ন্যাচার পার্কে যাওয়া যায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকত দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। বালুকাময় সৈকতের পাশাপাশি বন-উপবন, খাল-নদী, ঝিরি-ঝর্ণা, বন্যপ্রাণী, পাখ-পাখালি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই জেলাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর এসব পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠতে পারে পুরো কক্সবাজার।
সূত্র : রাইজিংবিডি
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



