একসময় পার্ল নদীর বদ্বীপ জুড়ে যে শব্দ প্রতিধ্বনিত হতো সেলাই মেশিনের ছন্দ, ঢালাই যন্ত্রের তীক্ষ্ণ আঘাত, দিনরাত তিন পালায় ছুটে চলা উৎপাদন লাইনের অবিরাম গুঞ্জন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে এক অস্বস্তিকর নীরবতায়।

চীনের শিল্পভূমি

Advertisement

চীনের গুয়াংডং, জিয়াংসু ও ঝেজিয়াংয়ের বিস্তীর্ণ শিল্পাঞ্চল যেন এক অদৃশ্য শূন্যতায় আচ্ছন্ন। তালাবদ্ধ কারখানার ফটক, বকেয়া মজুরির কাগজ আর শ্রমিকদের ক্লান্ত অপেক্ষা সব মিলিয়ে এক ধীরগতির সংকট ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

এটি কোনো সাময়িক অর্থনৈতিক ওঠানামা নয়, বরং বহুদিন ধরে জমে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতার একসঙ্গে ভেঙে পড়া। দীর্ঘ তিন দশক ধরে নির্মিত এক অসম অর্থনীতি যার ভিত্তি ছিল সস্তা শ্রম, রপ্তানিনির্ভর উৎপাদন এবং অতিরিক্ত বিনিয়োগ আজ নিজস্ব ভারেই কেঁপে উঠছে।

সংকটের তাৎক্ষণিক সূচনা আসে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠার পর হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। এই পথ দিয়েই চীন প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করত।

সরবরাহ হঠাৎ কমে আসায় কাঁচামালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ব্রোমিন, প্লাস্টিক, বস্ত্র সবখানেই দামের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। অতি সামান্য মুনাফায় টিকে থাকা রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোর জন্য এটি হয়ে ওঠে এক অনতিক্রম্য প্রাচীর।

কিন্তু এই বিপর্যয়ের শিকড় আরও গভীরে। বহু বছর ধরে অর্থনীতিকে এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ ভোগের চেয়ে রপ্তানি ও বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ফলে যখন বৈশ্বিক বাজারে চাপ তৈরি হয়, তখন পুরো কাঠামো একসঙ্গে কেঁপে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি মন্দা, তরুণদের বেকারত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের গভীর অনিশ্চয়তা।

এই সংকটের সবচেয়ে ভার বহন করছে শ্রমজীবী মানুষ। যারা জীবনের সেরা সময় কাটিয়েছে কারখানার ভেতর, তারা আজ দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি মজুরি নেই, ক্ষতিপূরণ নেই, ন্যায্যতার কোনো নিশ্চয়তা নেই। হুনান থেকে সিচুয়ান, অভ্যন্তরীণ মঙ্গোলিয়া থেকে গুয়াংঝু অসংখ্য শ্রমিক রাস্তায় নেমে এসেছে তাদের পাওনা আদায়ের দাবিতে।

কোথাও দুই সপ্তাহের ধর্মঘটের পর কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, কোথাও আবার বছরের পর বছর কাজ করা শ্রমিকদের বিদায় দেওয়া হয়েছে নিঃশব্দে, কেবল একটি নোটিশ টাঙিয়ে।

এই বাস্তবতায় শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া বিক্ষোভগুলোকে প্রশমিত করার বদলে দমন করার প্রবণতা দৃশ্যমান। শ্রমিকরা যখন নিজেদের কথা বলতে চায়, তখন তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়, ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কখনো ভয় দেখানো হয়। ফলে সংকট কেবল অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি ছড়িয়ে পড়ে সমাজের ভেতরেও।

অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় বক্তব্যে যেন ভিন্ন এক চিত্র আঁকা হয় স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের আশ্বাসে ভরা। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এই কথনের ব্যবধান দিন দিন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। শত শত কারখানা বন্ধ হওয়ার মাঝেও আশাবাদের উচ্চারণ মানুষের আস্থাকে ফিরিয়ে আনতে পারছে না।

পরিসংখ্যান জানায়, এই অস্থিরতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। কয়েক বছর ধরেই শ্রমিক বিক্ষোভ বাড়ছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যার কারণ ছিল বকেয়া মজুরি, কারখানা বন্ধ কিংবা স্থানান্তর। অর্থাৎ সংকটের বীজ অনেক আগেই রোপিত হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তারই পরিণতি।

একসময় যে অঘোষিত সমঝোতার ওপর এই অর্থনীতি দাঁড়িয়ে ছিল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিনিময়ে সামাজিক স্থিতি তা এখন ভেঙে পড়ার মুখে। সম্পদের মূল্যহ্রাস, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং দুর্বল সামাজিক সুরক্ষা মানুষের আস্থা ক্ষয়ে দিচ্ছে ধীরে ধীরে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি এসে দাঁড়ায় একটি রাষ্ট্রের শক্তি কোথায় নিহিত? শুধু ক্ষমতার কাঠামোয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করার সক্ষমতায়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সাফল্য দিয়ে যে ঘাটতিগুলো আড়াল করা হয়েছিল, আজ সেগুলোই সামনে চলে এসেছে।

কারখানার ফটকে দাঁড়িয়ে থাকা সেই শ্রমিক যার কাঁধে পরিবারের দায়, কিংবা সেই নারী শ্রমিক যার কয়েক মাসের মজুরি বকেয়া তারা কোনো বিদ্রোহী নয়। তারা সেই মানুষ, যারা নিয়ম মেনে জীবন কাটিয়েছে, উন্নয়নের অংশ হয়েছে, অথচ সংকটের সময়ে খুঁজে পাচ্ছে না কোনো আশ্রয়।

প্রতিটি বন্ধ কারখানা, প্রতিটি বকেয়া মজুরি, প্রতিটি দমিত কণ্ঠ সমাজের ভেতরে নতুন করে ফাটল তৈরি করছে। প্রশ্ন এখন আর ফাটল সৃষ্টি হচ্ছে কি না, বরং এই কাঠামো আর কতদিন সেই চাপ বহন করতে পারবে।

নিজ আসনেই ডুবলেন মমতা, জয়ী শুভেন্দু

ইউরেশিয়া রিভিউ নিউজের কলামটি অনুবাদ করেছেন- মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী- জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md Elias is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency across digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and reader-focused reporting.