ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ের পর ‘দেশ গড়তে ঐক্যের ডাক’ দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপিকে বিজয়ী করায় দেশবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, এ বিজয় বাংলাদেশের। এ বিজয় গণতন্ত্রের। এই বিজয় গণতন্ত্রকামী জনগণের। তিনি বলেন, আজ আমরা সবাই স্বাধীন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন দুর্বলতা। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
গতকাল শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) বিকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের বলরুমে জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিজয়ের পর এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বিএনপি।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সাবেক সচিব ইসমাঈল জবিউল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। উপস্থিত দেশিবিদেশি সাংবাদিকদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সমাপনী বক্তব্য দেন দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান।
সংবাদ সম্মেলনে মঞ্চে অন্যদের মধ্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, বেগম সেলিমা রহমান, মেজর অব. হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার গিয়াসউদ্দিন রিমন উপস্থিত ছিলেন।
নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করে দলীয় নেতা-কর্মীদের শান্ত ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান বিএনপির কর্ণধার তারেক রহমান। তিনি বলেন, যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে হবে এবং কোনো ধরনের সহিংসতা, প্রতিশোধ, অন্যায় বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে কোথাও কোথাও ভুল বোঝাবুঝি বা উত্তেজনা তৈরি হয়ে থাকতে পারে, তবে খেয়াল রাখতে হবে তা যেন কোনোভাবেই প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসায় রূপ না নেয়।
ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই বিজয় সমগ্র বাংলাদেশের, গণতন্ত্রের ও গণতন্ত্রকামী জনগণের। পথ-মত ভিন্ন থাকতে পারে, তবে দেশের স্বার্থে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। সংবাদ সম্মেলনে বিএনপিপ্রধান বলেন, আমার বক্তব্য স্পষ্ট। যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে। কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড কিছুতেই বরদাশত করা হবে না। দলমত, ধর্মবর্ণ কিংবা ভিন্নমত যা-ই হোক-কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না।
তিনি বলেন, ন্যায়পরায়ণতাই হবে আদর্শ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে সব প্রচেষ্টা বৃথা যেতে বাধ্য। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি কিংবা বিরোধী দল, অন্য মত কিংবা ভিন্নমত-প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর এটি ছিল তারেক রহমানের প্রথম সংবাদ সম্মেলন। জনাকীর্ণ এই সংবাদ সম্মেলনে দেশিবিদেশি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন তারেক রহমান।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থাকে (সার্ক) পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবে। তারেক রহমান বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে গণতন্ত্র কখনোই টেকসই হবে না। সরকারি বা বিরোধী দল-সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রযোজ্য হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচন-উত্তর পরিস্থিতিতে কেউ যেন সুযোগ নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি-এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। আপনাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর দেশে পুনরায় জনগণের সরাসরি ভোটে জনগণের কাছে দায়বদ্ধতামূলক সংসদ এবং সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। আর কোনো অপশক্তি যাতে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে না পারে, দেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে না পারে, এজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
এসময় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান তারেক রহমান। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশ গঠনে আপনাদের চিন্তাভাবনাও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথ এবং মত ভিন্ন থাকতে পারে কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা সবাই এক। আমি বিশ্বাস করি, জাতীয় ঐক্য আমাদের শক্তি, বিভাজন আমাদের দুর্বলতা। তারেক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলোই মূলত গণতন্ত্রের বাতিঘর। সরকার এবং বিরোধী দল যে যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করলে অবশ্যই দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।
সব সংশয় কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও অন্তর্বর্তী সরকারসহ নির্বাচনের অনুষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিশেষ ধন্যবাদ জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের রায় পেলে বিএনপি রাষ্ট্র মেরামত করবে বলে যে রূপরেখা উপস্থাপন করেছিল, অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল এবং সারা দেশে জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে ৩১ দফা প্রণয়ন করেছিল। ৩১ দফার আলোকে ঘোষণা করা হয়েছিল দলীয় ইশতেহার। একই সঙ্গে কয়েকটি বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে বিএনপি জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছিল। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ প্রত্যাশিত প্রতিটি অঙ্গীকার পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করব।
দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক ছাড়াও দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের সামনে আজকের এই সময়টি ভীষণ আনন্দের। এমন এক আনন্দঘন পরিবেশে আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি আমাদের ভারাক্রান্ত করে। রাষ্ট্র ও রাজনীতিতে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার এমন একটি গণতান্ত্রিক সময়ের প্রত্যাশায় তিনি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন লড়েছিলেন। স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে কখনোই আপস করেননি। দেশ এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে বরাবরই তিনি ছিলেন অটল-অবিচল। আমরা আল্লাহর দরবারে মরহুম খালেদা জিয়ার মাগফিরাত কামনা করছি।
তারেক রহমান আরও বলেন, স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত বিএনপিকে দেশের জনগণ আবারও রাষ্ট্র পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছে। জনগণ বিএনপির প্রতি যে বিশ্বাস এবং ভালোবাসা দেখিয়েছে-এবার জনগণের জীবনমান উন্নয়নের জন্য নিরলস কাজের মাধ্যমে জনগণের এই বিশ্বাস এবং ভালোবাসার প্রতিদান দিতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।
বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও আপনারা রাজপথ ছাড়েননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অটুট-অনড় ছিলেন। এবার দেশ গড়ার পালা। দেশ পুনর্গঠনের এই যাত্রায় আপনি, আমি, আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এই বিজয়কে শান্তভাবে দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে উদ্যাপন করেছি।
নির্বাচন-উত্তর বাংলাদেশে যাতে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, এজন্য শত উসকানির মুখেও আমি সারা দেশে বিএনপির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের শান্ত এবং সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি। বিএনপি চেয়ারম্যান তাঁর বক্তব্যে বলেন, নির্বাচনের পর আমরা শান্তভাবে বিজয় উদ্যাপন করেছি। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি যেন সৃষ্টি না হয়, সেজন্য আমি দল এবং জোটের নেতা-কর্মীদের আনন্দ মিছিল করতে নিষেধ করেছি। আমরা দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে বিজয়ের শুকরিয়া আদায় করেছি।
সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করবে : সার্ক ইস্যুতে প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশই সার্কের উদ্যোক্তা ছিল। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমরা চাইব সার্ক পুনরুজ্জীবিত হোক। আশিক দশকের শুরুতে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সার্ক গঠনের উদ্যোগ নেন। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে একাধিক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থ সামনে রেখেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি ঠিক হবে।
বিদেশি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের মানুষের স্বার্থই সব থেকে আগে, তাদের স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রেখেই পররাষ্ট্রনীতি ঠিক করব আমরা। এ সময় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কোনো একক দেশের প্রতি আনুগত্য নয়- পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতেই ঠিক হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, অকার্যকর করে দেওয়া সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি- এমন একটি পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনাকে দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বিএনপি সরকার কী ধরনের উদ্যোগ নেবে? বিদেশি সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, সেটি দেশের আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


