Advertisement
জুমবাংলা ডেস্ক : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামের উম্মে কুলসুম নামের ১৩ বছর বয়সের এক কিশোরী জীবন যুদ্ধে পারি দিয়েছিলেন সৌদি আরবে। রান্না করা, ঘর মোছা, ঘর গুছানো থেকে শুরু সব কাজ করতে হত শিশু উম্মে কুলসুমকে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে থেকে যাওয়া কিংবা উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে চাইলে তাও মিলত না। ক্ষুধায় কাতরানো যেন নিত্যদিনের ঘটনা। নিজের বেতনের টাকায় আনা খাবারও নিয়ে যেত বাড়ির ছোট্ট শিশুরা। এসব নিয়ে কথা বললেই চলতো নির্যাতন। কুলসুমের ওপর নজর পড়ে বাড়ির মালিকের ছেলের। একদিন সে মূর্তীমান বিভীষিকা হয়ে হাজির হলো। ১৩ বছর বয়স পার করা মেয়েটির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে চায় ওই ছেলে। একদিন তাকে জোরপূর্বক বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পিড়াপীড়ি শুরু করে। ধর্মীয় অনুসাশনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুলসুম কোনোভাবেই এতে রাজি হয় না। মালিকের ছেলের সাফ কথা, ‘বাংলাদেশ থেকে তাদেরকে আনাই হয় এসব কাজের জন্য’। এক কথা দুই কথায় কুলসুমের ওপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়্গ। নিপীড়নের পর ফেলে রাখা হয় বাড়ির বাইরে। পুলিশ কুলসুমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়।

কুলসুম এখন বেঁচে নেই। কয়েক মাস মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সৌদি আরব থেকে লাশ হয়ে ফিরেছে নিজ বাড়িতে। কুলসুম ওরফে সানজিদার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার গোকর্ণ ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামে। সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় ১৭ মাস আগে কুলসুমকে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। গত শুক্রবার রাতে কুলসুমের লাশ দেশে আসে। পরদিন এলাকার কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়। ৯ আগস্ট সৌদি আরবের কিং ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় কুলসুম।

বাবা শহিদুল ইসলাম ও মা নাসিমা বেগমের কাছ থেকেই কুলসুমের উপর এমন বর্বরতার বিষয়টি জানা। মোবাইল ফোনে প্রায়ই নির্যাতনের কথা জানাতো কুলসুম। বলতো দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার কথা, বেতন না পাওয়ার কথা। তবে বেশ কয়েকমাস ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো না কুলসুমের। জানুয়ারি মাসে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় এক নার্সের মোবাইল ফোন থেকে সর্বশেষ কল করে কুলসুম।

প্রায় সাড়ে তিন মিনিটের এক ভিডিও কলে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে উম্মে কুলসুম। কফিল মানে মালিক, তাকে নির্যাতন করে পা ভেঙে দিয়েছে বলে সে জানায়। সে আর হাঁটাচলা করতে পারছে না। ওই ভিডিও কলে সে কোমর থেকে নীচের অংশের আঘাতের চিহ্নও দেখায়।

ঘটনা সম্পর্কে জানতে সোমবার দুপুরে মোবাইল ফোনে কথা বললে মা নাসিমা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়েন। মেয়েকে হত্যার অভিযোগ এনে বাবা শহিদুল ইসলাম বিচার না পাওয়ার শঙ্কার কথা বলেন এ প্রতিবেদকের কাছে। বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি করে মেয়ে হত্যাকারীদের বিচারও দাবি করেন তারা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে কুলসুম ছিলেন দ্বিতীয়। ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে যায় সে। এছাড়া সৌদি যাওয়ার স্থানীয় মাধ্যম আব্দুর রাজ্জাকের মেয়েও সেখানে যায়। প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কুলসুমকে সৌদিতে পাঠানো হয়। পরে আরো ভালো বাড়ি দেয়ার কথা হলে কুলসুমের বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন আব্দুর রাজ্জাক। এদিকে কুলসুমের লাশ আসার পর থেকেই পলাতক রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, নাসিরনগরের নূরপুর লাহাজুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩.০৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় কুলসুম। ওই সনদপত্রে কুলসুমের জন্ম তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০০৬ সাল লেখা। অথচ তার পাসপোর্টে জন্মতারিখ উল্লেখ আছে ১৩ মার্চ ১৯৯৩। মূলত মেয়েকে সৌদি আরব পাঠিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতেই সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা নিয়ে কৌশলে হেরফের করান পরিবারের সদস্যরা। ৭ মার্চ ২০১৯ ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক অফিস থেকে পাসপোর্টটি ইস্যু করা হয়। ভিসা ইস্যু হয় ২০ মার্চ।

কথা হলে পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবের বাড়ির মালিক ও তার ছেলে কুলসুমের দুই পা, হাত ও কোমর ভেঙে দেয়। নষ্ট করে ফেলে একটি চোখ। এসব নির্যাতনের কথা জেনে স্থানীয় যে ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠানো হয় তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়। তিনি কুলসুমকে অন্য বাড়িতে দেবেন বলেও আশ্বস্ত করেন। ঢাকার এজেন্টও একই কথা জানান। কিন্তু ওই এজেন্টের লোকজন এক পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

কুলসুমকে নির্যাতন, বেতন কম দেয়াসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে নাসিরনগর থানা পুলিশ কয়েকমাস আগে লিখিতভাবে জানানো হয়। লিখিত অভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত হলেও কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে কুলসুমের পরিবারের অভিযোগ।

এদিকে, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর কুলসুমের গত ১৭ আগস্ট একটি লিখিত দেন। সেখানে তিনি মেয়ের লাশ দেশে আনা ও আট মাসের বকেয়া বেতন পাওয়ার আবেদন করেন। মেয়ের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের অভিযোগ এনে তিনি জানান, মেসার্স এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়েকে তিনি সৌদিতে পাঠিয়েছিলেন। তবে ওই আবেদনে সৌদিতে পাঠানোর স্থানীয় মাধ্যম আব্দুর রাজ্জাকের নাম তিনি উল্লেখ করেননি।

গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সোয়াব আহমেদ রিতুল বলেন, ‘কয়েকমাস আগে থানায় একটা জিডি করা হয়েছে বলে মেয়ের বাবা আমাকে জানায়। এরপর আর কিছু জানতাম না। পরবর্তীতে সেদিন মেয়েটির লাশ আসার কথা শুনে আইনি ব্যবস্থা নেয়া যায় কি-না সে বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলি। মেয়েটির বাবা জানিয়েছে তার মেয়েকে সৌদিতে নির্যাতন করা হয়েছে।

নাসিরনগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. কবির হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ওই মেয়ের বাড়িতে পুলিশ পাঠানো হয়। তবে সৌদি থেকে পাঠানো কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে মেয়েটি দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। এছাড়া যেহেতু দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে লাশ দেশে এসেছে সেক্ষেত্রে আমারা কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমা আশরাফী সাংবাদিকদেরকে জানান, কুলসুমের লাশ আসার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে যদি এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয় তাহলে সেটা করা হবে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Saiful Islam is a journalist at Zoom Bangla News with seven years of experience in news writing and editorial work. He contributes to producing accurate, well-structured, and reader-focused content across digital platforms. His work reflects a strong commitment to editorial standards and responsible journalism.