বনের উষ্ণ বাতাস ভেদ করে হঠাৎ এক ভ্যাপসা গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশ। গন্ধটি ছিল মাশরুমের মতো, তবে আরও বাজে, ঠিক যেন পচনের গন্ধ। গত অক্টোবরে দক্ষিণ-পশ্চিম মাদাগাস্কারের আন্দোম্বিরি বনে বিশালাকার এক বাওবাব গাছের কাছে গিয়ে ফরাসি গবেষক সিরিল কর্নুর বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছিল। তিনি দেখলেন, গাছের গোড়া থেকে একধরনের কালো, দুর্গন্ধযুক্ত তরল নিঃসৃত হচ্ছে। গত ১৫ বছর ধরে বাওবাব নিয়ে গবেষণা করা কর্নু বলেন, আমি বেশ অবাক হয়েছিলাম, কারণ এমন দৃশ্য আগে কখনও দেখিনি। তখনই মনে হয়েছিল যে, কিছু একটা বড় ধরনের গড়বড় হয়েছে।

বাওবাব গাছ
শত শত বছর টিকে থাকার পর গাছটি এখন তার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ২০২৫ সালের ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস
Advertisement

মাদাগাস্কারের অন্যতম বৃহত্তম ও প্রাচীনতম এই বাওবাব গাছটি, যাকে স্থানীয়রা ‘সিতাকাকান্তসা’ নামে ডাকে, তা এখন মৃত্যুশয্যায়। শত শত বছর টিকে থাকার পর গাছটি এখন তার শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাছটি ভেঙে পড়বে, ধসে যাবে এবং একসময় পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে যাবে। এটি হতে কয়েক মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাটিতে কেবল একটি কালো ছায়ার মতো দাগ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না। বনকেন্দ্রিক স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে এই গাছের মৃত্যু মানে একটি আধ্যাত্মিক আশ্রয় হারিয়ে যাওয়া। আর বিজ্ঞানী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এটি দ্রুত বদলে যাওয়া জলবায়ুর কারণে প্রকৃতির সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভগুলোরও ভেঙে পড়ার এক নির্মম ইঙ্গিত।

মাদাগাস্কারের রাজধানী আন্তানানারিভোর চিম্বাজাজা জু অ্যান্ড বোটানিক্যাল গার্ডেনসের বাওবাব গবেষক অনজা রাজানামারো বলেন, এই গাছটি স্থানীয় প্রাকৃতিক দৃশ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, যাকে স্থানীয় মানুষ নিজেদের মা-বাবার মতো ভক্তি করত।

প্রকাণ্ড কাণ্ড আর উল্টানো শিকড়ের মতো আকাশের দিকে ছড়িয়ে থাকা ডালপালার এই বাওবাব গাছগুলো লাখ লাখ বছর ধরে মাদাগাস্কারের প্রকৃতির অংশ। ওক বা পাইন গাছের মতো শক্ত না হয়ে এর কাঠ মূলত স্পঞ্জের মতো জলীয় উপাদানে ভরা থাকে, তাই অনেক বিশেষজ্ঞ একে দানবীয় সাকুলেন্ট বলেন। মাদাগাস্কার, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া যাওয়া বাওবাবের আটটি প্রজাতি শত শত, এমনকি হাজার বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। মাদাগাস্কারজুড়ে এই গাছগুলো ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু, পানি ধরে রাখার প্রাকৃতিক আধার এবং এর ফল সংগ্রহ ও পর্যটনকে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখে।

‘সিতাকাকান্তসা’ মূলত বাওবাবের অন্যতম বৃহৎ একটি প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় মালাগাসি উপভাষায় এর নামের অর্থ হলো, ‘কাণ্ডের একপাশে দাঁড়িয়ে গান গাইলে অন্যপাশ থেকে সেই গান শোনা যাবে না’। ২০১৮ সালে আন্দোম্বিরি গ্রামের ‘সিতাকাকোইকে’ নামের আরেকটি পবিত্র বাওবাব গাছের মৃত্যুর পর গ্রামবাসীরা এই এই গাছটিকে তাদের নতুন আধ্যাত্মিক উত্তরসূরি হিসেবে বেছে নেয়। কাছাকাছি আকারের অন্যান্য বাওবাবের রেডিওকার্বন ডেটিং অনুযায়ী এই গাছটির বয়স আনুমানিক ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ বছর। আধ্যাত্মিক স্বীকৃতির পর এটি পর্যটকদেরও আকর্ষণ করতে শুরু করে।

প্রকৃতি বিষয়ক গাইড ও গবেষক উইলফ্রেড রামাহাফালি জানান, গত আগস্টেই তিনি গাছের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখেছিলেন এবং ফেব্রুয়ারি নাগাদ এর কাণ্ডে বিশাল সব ফাটল দেখা দেয়। তিনি বলেন, বাওবাব গাছটির অর্ধেক অংশ ইতোমধ্যেই ভেঙে পড়েছে এবং এর ভেতরে ছত্রাক ধরেছে। গাছের গোড়াটি এখন খুবই নড়বড়ে।

এই পরিস্থিতিতে আন্দোম্বিরি গ্রামে এখন শোকের ছায়া। অনুবাদকের মাধ্যমে গ্রামের প্রধান মাম্পিয়াভি বলেন, সবাই ভীষণভাবে মর্মাহত। সিতাকাকান্তসা আমাদের গ্রাম ও বাসিন্দাদের জন্য অনেক আশীর্বাদ বয়ে এনেছিল। এই পবিত্র বাওবাব ছাড়া আমাদের জীবন কাটানো খুব কঠিন হবে।

তিনি জানান, গ্রামবাসীরা ইতোমধ্যে বনের মধ্যে বিকল্প হিসেবে উৎসর্গ করার মতো আরেকটি বড় বাওবাব গাছের সন্ধান করছেন।

বাওবাব পরিবেশবিদ সারাহ ভেন্টার জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী ভারী বৃষ্টিপাত বা ক্রান্তীয় ঝড়ের কারণে গাছটিতে মারাত্মক ছত্রাক সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। যেহেতু বাওবাব গাছে পানির পরিমাণ বেশি থাকে, তাই অতিরিক্ত পানির সংস্পর্শে এলে এদের শিকড় পচে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অবশ্য বয়স ও রোগে দুর্বল হলেও বাওবাবের ঘুরে দাঁড়ানোর নজির রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড় এবং জমি পরিষ্কার করার জন্য আগুন লাগানোর মতো প্রথাগত কৃষিকাজের কারণে মাদাগাস্কারের বাওবাব গাছগুলো এখন চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষক রাজানামারো জানান, দ্বীপে নতুন বাওবাব গাছ জন্মানোর হার অত্যন্ত সীমিত এবং তহবিলের অভাবে নতুন বনায়ন কর্মসূচিগুলোও আলোর মুখ দেখছে না।

আরও পড়ুনঃ

নতুন শক্তিতে আইকনিক বুলেট, ৬৫০ সিসি সংস্করণ আনছে রয়্যাল এনফিল্ড

একসময় যখন এই হাজার বছরের অতিমানবীয় গাছটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যাবে, তা হবে এক রূঢ় শূন্যতা। রাজানামারোর ভাষায়, শেষ পর্যন্ত আপনার সামনে কেবল একটি বিশাল শূন্য গর্ত পড়ে থাকবে। এরপর এটি শুধুই একটি স্মৃতি, আপনি আপনার সবকিছুই হারাবেন।

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Tarek Hasan is a professional journalist and currently works as a sub-editor at Zoom Bangla News. With six years of experience in journalism, he is an experienced writer with a strong focus on accuracy, clarity, and editorial quality. His work contributes to delivering reliable and engaging news content to digital audiences.