Advertisement

আশিক আহমেদ ও কাজী রফিক : ২০০৫ সালে বিয়ে করার কথা ছিল জজ মিয়ার। সবকিছু ঠিকঠাক। গায়ে হলুদের দিন আচমকা ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গ্রেনেড হামলার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কোনো অপরাধ না করেও সে মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় হকার জজ মিয়াকে। নির্যাতনের মুখে তাকে দিয়ে স্বীকার করানো হয়, তিনি হামলায় জড়িত। পাঁচ বছর জেল খেটে তিনি জামিনে ছাড়া পান। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে সময় লাগে ১৫ বছর।

এখন সেই জজ মিয়া স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও হারানো সেসময়গুলো পদে পদে যেন বাধা হয়ে উঠছে তার। বর্তমানে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন তিনি। বিয়ে করেছেন, এক কন্যা সন্তানের বাবাও হয়েছেন। গ্রেনেড হামলার মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ায় জজ মিয়ার জীবন থেকে অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। সময়মতো বিয়ে বা বিয়ের পর সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু করতে পারছেন না তিনি। আর এখনো জীবনের শঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। দেশের জনপ্রিয় একটি অনলাইন পোর্টালের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তিনি এসব কথা জানান।

জজ মিয়ার আসল নাম মো. জাফর ওরফে জজ মিয়া। তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জজ মিয়া বলেন, ‘২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ গ্রেনেড হামলার ঘটনায় ২০০৫ আমার বিরুদ্ধে এই হামলার অভিযোগে এনে আমাকে গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন।’

ক্রসফায়ার আর নির্যাতনের মুখে গ্রেনেড হামলায় জড়িত থাকার কথা শিকার করতে বাধ্য হয় জন মিয়া। বলেন, ‘ঢাকায় আসার পথে তারা আমাকে গ্রেনেড হামলা বিষয়ে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। হামলার বিষয়টি আমি শিকার না করায় রাস্তায় আমাকে ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়। আমি বলি স্যার আমাকে ক্রসফায়ার দিয়েন না। আমি বাঁচতে চাই। তখন তারা আমাকে বললো, গ্রেনেড হামলা সম্পার্কে আমরা যে ভাবে বলে দিবে তুই সেভাবেই শিকার করবি। তখন আমি বললাম ঠিক আছে স্যার আমাকে কষ্ট দিয়েন না। আপনারা যেভাবে বলবেন আমি সেভাবেই স্বীকার করব।’

‘তারা আমাকে ঢাকায় নিয়ে এসে একুশে আগস্ট কিভাবে হামলা হয়েছে তা আমাকে দেখালো আর বললো এভাবেই স্বীকারোক্তিতে বলবি। তখন আমি বলি, স্যার এটা আমি কেমনে স্বীকার দিমু, আমি তো এই হামলায় ছিলাম না। এই হামলা হওয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আমি হামলার প্রতিবাদ করছি। আর এখন স্বীকারোক্তি দিতে পারব না। তখন বলে তোকে স্বীকারোক্তি দিতেই হবে। নইলে তোকে ক্রসফায়ার দিয়ে দিব। এই সময়ে আমাকে বিভিন্ন ভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘একপর্যায়ে আমি দেখলাম আমার স্বীকারোক্তি না দিয়ে কোনও উপায় নাই। আমি তখন নিরুপায়। আমি তাদের কথা রাজি হই। এরপর তারা ঢাকার ভিতরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম আমাকে বললে দেয়। আমাকে বলে, ওপরের নির্দেশ মঞ্চের উপর গ্রেনেড মেরেছি এবং এই কথাগুলোর রেকর্ড নেয়।’

জবাববন্দির সময়ও পুলিশের পক্ষ থেকে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল বলে জানান জজ মিয়া। বলেন, ‘তাদের কথামতো কোর্টে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট সামনে জবানবন্দি দিলাম। কিন্তু আমার যেগুলো কথা ভুল হচ্ছে সেগুলো এসপি ও মুন্সি তারা আবার আমাকে বলে দিচ্ছে ওইগুলা আবার ম্যাজিস্ট্রেট রেকর্ড করেছে। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে বলল এটা তুমি উচ্চ আদালতেও স্বীকারোক্তি করবে। নইলে কিন্তু তোমার এই স্বীকারোক্তিতে ফাঁসি হবে। উচ্চ আদালতে স্বীকারোক্তি দিলে তারা তোমারে সাক্ষী রাখবো এই কথা বলে তারা আমাকে জেলে পাঠালো।’

পাঁচবছর জেল খেটে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কথা জানান তিনি। জজ মিয়া বলেন, ‘জেলখানা থেকে আমাকে তারা কাশিমপুর কারাগারে চালান করে দেয়। ওইখানে আমি ৫ বছর জেল খেটেছি। পাঁচ বছর পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলো মামলার পুনঃতদন্ত গেল। এই মামলা থেকে আমি অব্যাহতি পাই। মুক্তি পাওয়ার পরে আমি জেলখানা থেকে বের হয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে বলেছি। আমি আগে কোনো দল করতাম না। কিন্তু এখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছি। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন এই দল করে যাব।’

দীর্ঘ ১৫ বছর পর মামলায় সঠিক রায় পেয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়ে জজ মিয়া বলেন, ‘এই মামলার রায়ে আমি সন্তুষ্ট। এই মামলার যারা মূল হোতা, যারা পরিকল্পনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হত্যা করতে চেয়েছিল। আমি চাই আসামিদের ফাঁসির রায় কার্যকর করে এই কলঙ্কময় অধ্যায় সমাপ্তি ঘটুক। বাংলাদেশ কলঙ্কমুক্ত হোক।’

সরকারের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘এই মামলায় আমি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। সরকার যেন আমাকে মানবতার দৃষ্টিতে পূর্ণবাসন করে দেয়। আমাকে যেন স্বাভাবিক জীবনযাপনের জন্য একটা সরকারি চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়া হয়।’

‘গ্রেপ্তার হওয়ার আগে আমি স্বাভাবিক জীবন যাপন করেছি আমি পরিবার-পরিজনের অনেক ভালোই ছিলাম। কিন্তু বিএনপি-জামাত সরকার যখন আমাকে জজ নিয়ে বানায় দিলো। তখন দেশসহ বহির্বিশ্বের কাছে আমি সন্ত্রাস নামে পরিচিত হয়ে গেলাম। আমার এই সন্ত্রাসী নামের কলঙ্ক কে মুছে দিবে? সরকারের কাছে আমার দাবি আমাকে যেন কলঙ্ক থেকে মুক্তি করে দেওয়া হয়।’

বিয়ের আগের দিন আটক হয়েছিলেন জজ মিয়া। জেল থেকে বের হয়ে বিয়ে করেন তিনি। কিন্তু গ্রেনেড হামলা মামলায় জড়িত থাকার কথা জানার পর সেই বউয়ের সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হয় তার। পরবর্তিতে আবারও বিয়ে করেছেন তিনি। কিন্তু সমাজের কাছে নিজের সন্তানের স্বাভাবিক পরিচয় চান জজ মিয়া।

তিনি বলেন, ‘যেদিন আমি বিয়ে করবো সেদিনই আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন আমার আর বিয়ে করা হয়নি। পরে জেল থেকে বের হওয়ার পরে আমি বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু যখন আমার বউ জানতে পারে, আমি গ্রেনেড হামলা মামলার সঙ্গে জড়িত, তখন সে আমাকে ডিভোর্স করে। পরে আমি আবার বিয়ে করছি, আমার একটা মেয়ে আছে। কিন্তু সমাজে ও দেশের কাছে আমার সন্তানকে কি পরিচয় দিয়ে বড় করমু?

বিএনপি-জামাতের ভয়ে এখনো নিয়মিত বাসা বদলাতে হয় তাকে। শঙ্কিত নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমাকে যদি বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীরা মেরে ফেলে, এই দায় কে নেবে? আমি সরকারের কাছে নিরাপত্তা চাই। আমি রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। আমাকে যে কোনও মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারে। আমি অনেক এমপি-মন্ত্রীর কাছে গিয়েছি। সবাই আমাকে আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু কেউ আমার কাজ করে দেয়নি। দলীয় নেতাকর্মীরাও আমাকে কোনো সহযোগিতা করে না।’

সূত্র : ঢাকা টাইমস্

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.