বিশেষ প্রতিনিধি: পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার ৫ নম্বর মঠবাড়িয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম ফারুক হাসান (কাঠ ফারুক)-এর বিরুদ্ধে অস্তিত্বহীন একটি এতিমখানার নামে সরকারি অনুদানের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনের প্রাথমিক অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট ঠিকানায় কোনো এতিমখানা, শিশু সদন বা হেফজখানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্ত চলমান রয়েছে।
অভিযোগকারী মো. জাকির হোসেন সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, মঠবাড়িয়া সদর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে “ফারুক হাসান শিশু সদন (এতিমখানা) ও হেফজখানা” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সরকারি অনুদান গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ওই ঠিকানায় কোনো এতিমখানা পরিচালিত হয় না এবং সেখানে কোনো এতিম শিশুর বসবাসও নেই।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বেসরকারি এতিমখানা ও শিশু সদনের জন্য সরকার যে অনুদান বরাদ্দ দেয়, তার আওতায় “ফারুক হাসান শিশু সদন (এতিমখানা) ও হেফজখানা” নামের প্রতিষ্ঠানের জন্য জুলাই থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ছয় মাসের অনুদান বাবদ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি নথিতে প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্ব দেখিয়ে এই অর্থ গ্রহণ করা হলেও বাস্তবে সেখানে এতিমখানার কোনো কার্যক্রম নেই।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, কথিত প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান হিসেবে যে স্থানটি দেখানো হয়েছে, সেখানে গিয়ে কোনো আবাসিক শিশু সদন, এতিমখানা কিংবা এতিম শিশুদের থাকার ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া যায়নি। এলাকাবাসীর অনেকেই দাবি করেছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় বসবাস করলেও “ফারুক হাসান শিশু সদন” নামে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে দেখেননি।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুন মঠবাড়িয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুদীপ্ত দেবনাথ সরেজমিন তদন্তে যান। তদন্তকালে অভিযোগে উল্লেখিত স্থানে কথিত এতিমখানা, শিশু সদন, হেফজখানা বা মাদ্রাসার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মঠবাড়িয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুদীপ্ত দেবনাথ অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আমলে নিয়ে বিষয়টি নিয়ে আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষ হওয়ার পরই বিস্তারিত বলা যাবে।”
স্থানীয়দের ভাষ্য, সরকারি অনুদান পাওয়ার জন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, কার্যক্রম, উপকারভোগীর সংখ্যা এবং অন্যান্য তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে।
এ কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের বাস্তব অস্তিত্ব না থাকলেও কীভাবে তার নামে সরকারি অনুদান বরাদ্দ ও উত্তোলন হলো, সে প্রশ্ন এখন এলাকাবাসীর মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
অভিযোগকারী জাকির হোসেন বলেন, এতিম ও অসহায় শিশুদের কল্যাণে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ যদি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে না পৌঁছে থাকে, তবে এটি শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, সামাজিক ও নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। তিনি পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, অভিযোগের পর শুধু চলতি অর্থবছরের অনুদান নয়, অতীতের বরাদ্দ ও অর্থ উত্তোলনের তথ্যও যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ স্থানীয়ভাবে এমন তথ্য পাওয়া গেছে যে, একই প্রতিষ্ঠানের নামে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে সরকারি অনুদান গ্রহণ করা হয়েছে। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা বলছেন, সরকারি অনুদান ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হলো এতিম, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা। সেই অর্থ যদি কোনো অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়ে থাকে, তাহলে তা রাষ্ট্রের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি প্রকৃত উপকারভোগীদের অধিকার হরণেরও শামিল।
তাঁদের মতে, ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নাকি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি সংঘবদ্ধ প্রক্রিয়ার অংশ, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। একই সঙ্গে সরকারি অনুদান অনুমোদন, তদারকি এবং অর্থ বিতরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে অভিযোগকারী দাবি করেছেন, শুধু এতিমখানার অনুদান নয়, মঠবাড়িয়া সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বরাদ্দ এবং বাস্তবায়ন নিয়েও অতীতে নানা অভিযোগ উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে পৃথকভাবে কোনো তদন্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবিএম ফারুক হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুনঃ
বর্তমানে বিষয়টি প্রশাসনের তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত শেষে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং নথিপত্র যাচাইয়ের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



