ঈদের সকালটা শুরু হয় নামাজের পর ব্যস্ততা আর উৎসবের আনন্দে। উঠানে কোরবানির প্রস্তুতি, রান্নাঘরে মসলার সুবাস, বড় হাঁড়িতে টগবগ করে ফুটতে থাকা মাংস—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবহ। বছরের অন্য সময়ে হয়তো গরুর মাংস খুব একটা খাওয়া হয় না, কিন্তু কোরবানির ঈদে অনেক পরিবারে সকাল, দুপুর, রাত-প্রতিটি খাবারের টেবিলেই থাকে গরুর মাংসের নানা পদ।

গরুর মাংস কতটা খাবেন

Advertisement

কেউ পছন্দ করেন ভুনা, কেউ কালাভুনা, কেউ আবার ঝোল কিংবা কাবাব। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানো, অতিথি আপ্যায়ন, ফ্রিজ ভর্তি করে সংরক্ষণ-সব মিলিয়ে গরুর মাংস যেন ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের মাঝেই চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা প্রতি বছর একটি বিষয় নিয়ে সতর্ক করেন-অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া শরীরের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

অনেকেই মনে করেন, গরুর মাংস মানেই কোলেস্টেরল, চর্বি আর হৃদরোগের ঝুঁকি। আবার কেউ কেউ একেবারেই মাংস এড়িয়ে চলেন। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, এই দুই ধারণার মাঝখানেই রয়েছে আসল সত্য।

গরুর মাংস যেমন অতিরিক্ত খেলে ক্ষতিকর হতে পারে, তেমনি নিয়ম মেনে ও পরিমিত পরিমাণে খেলে এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস।

বিবিসির এই প্রতিবেদনে বলা হয়, এই মাংস আপনার জন্য উপকারী নাকি ক্ষতিকর হবে—তা নির্ভর করে আপনি কতটা পরিমাণে এবং কীভাবে খাচ্ছেন তার ওপর।

গরুর মাংসে লুকিয়ে আছে যেসব পুষ্টিগুণ

গরুর মাংসকে শুধু “লাল মাংস” হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ এতে রয়েছে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চমানের প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন বি-কমপ্লেক্সের বিভিন্ন উপাদান।

এই পুষ্টিগুলো শরীরে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে।

বিশেষ করে- শরীরের পেশি গঠনে সাহায্য করে, রক্তস্বল্পতা কমাতে ভূমিকা রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, শিশুদের বৃদ্ধি ও মেধা বিকাশে সহায়তা করে, শরীরের দুর্বলতা ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে, ত্বক, চুল ও নখ সুস্থ রাখে, স্মৃতিশক্তি ও কর্মোদ্যম বাড়াতে সহায়তা করে ।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, গরুর মাংসে থাকা আয়রন ও ভিটামিন বি-১২ এমন কিছু উপাদান, যা অনেক সময় অন্য খাবার থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।

গরুর মাংস নিয়ে এত ভয় কেন?

এই ভয়ের প্রধান কারণ হলো চর্বি ও কোলেস্টেরল। গরুর মাংসের কিছু অংশে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস নিয়মিত খেলে শরীরে কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। আর কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে সেটি ধীরে ধীরে রক্তনালিতে জমে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত করে।

ফলে বাড়তে পারে- হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি।

তবে পুষ্টিবিদদের মতে, “গরুর মাংস মানেই বিপদ”- এমন ধারণাও সঠিক নয়। কারণ ক্ষতির বড় অংশ নির্ভর করে একজন মানুষ কতোটুকু মাংস খাচ্ছেন এবং কীভাবে রান্না করছেন, তার ওপর।

কার জন্য কতোটুকু গরুর মাংস নিরাপদ?

মানুষের শরীরে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ প্রোটিন প্রয়োজন হয়। এই চাহিদা সবার জন্য এক নয়।

পুষ্টিবিদ চৌধুরী তাসনিম হাসিনের মতে, একজন মানুষের ওজন, বয়স, শারীরিক অবস্থা ও রোগ অনুযায়ী প্রোটিনের পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

ধরা যাক, একজন মানুষের আদর্শ ওজন ৫০ কেজি। তিনি যদি সুস্থ থাকেন, তাহলে প্রতিদিন তার প্রয়োজন হতে পারে প্রায় ৫০ গ্রাম প্রোটিন।

তবে-কিডনি রোগে আক্রান্ত হলে প্রোটিন কম খেতে হবে, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্রোটিনের চাহিদা বেড়ে যায়, মাসিক চলাকালীন সময়েও নারীদের শরীরে বাড়তি পুষ্টির প্রয়োজন হয়, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষদের জন্যও বেশি প্রোটিন দরকার হতে পারে। অর্থাৎ সবার জন্য একই পরিমাণ গরুর মাংস নিরাপদ নয়।

ঈদের সময় সবচেয়ে বড় ভুল কী করে?

ঈদের সময় সবচেয়ে সাধারণ যে ভুলটি মানুষ করে, সেটি হলো- টানা কয়েকদিন অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়া।

সকালে নেহারি, দুপুরে ভুনা, রাতে কাবাব- এর সঙ্গে আবার কোমল পানীয়, পোলাও, বিরিয়ানি। ফলে শরীরে একসঙ্গে অতিরিক্ত ক্যালরি, চর্বি ও সোডিয়াম প্রবেশ করে।

পুষ্টিবিদদের মতে, গরুর মাংস প্রতিদিন না খাওয়াই ভালো।

নিরাপদ মাত্রা কী?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী-

সপ্তাহে দুই দিনের বেশি গরুর মাংস না খাওয়াই ভালো

মোট তিন থেকে পাঁচ বেলা খাওয়া যেতে পারে

প্রতি বেলায় ২-৩ টুকরার বেশি না খাওয়াই নিরাপদ

অর্থাৎ ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে গিয়ে এক বসায় আধা প্লেট মাংস খাওয়াটা শরীরের জন্য মোটেও ভালো সিদ্ধান্ত নয়।

যাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে

কিছু মানুষের জন্য গরুর মাংস খাওয়ার ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

যেমন-

ডায়াবেটিস রোগী

হৃদরোগী

উচ্চ রক্তচাপের রোগী

কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি

অতিরিক্ত ওজনের মানুষ

চিকিৎসকরা বলছেন, এ ধরনের রোগীরা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।

গরুর মাংস কীভাবে রান্না করলে ক্ষতি কমবে?

শুধু কতোটুকু খাচ্ছেন সেটাই নয়, কীভাবে রান্না করছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

চর্বি ফেলে দিন

মাংসের গায়ে সাদা চর্বির স্তর যতটা সম্ভব কেটে ফেলতে হবে। কারণ এই অংশেই সবচেয়ে বেশি ফ্যাট থাকে।

আগে ফুটিয়ে নিন

অনেকে রান্নার আগে মাংস কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে প্রথম পানি ফেলে দেন। এতে কিছু চর্বি কমে যায়।

অতিরিক্ত তেল-মসলা নয়

ঘি, ডালডা, মাখন বা অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করাই ভালো।

ভুনার বদলে ঝোল

অতিরিক্ত কষানো বা ভুনা না করে ঝোল ঝোল রান্না তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর।

টক উপাদান ব্যবহার করুন

ভিনেগার, লেবুর রস বা টক দই দিয়ে রান্না করলে চর্বি কিছুটা কমানো যায়।

সবজি মেশান

লাউ, মিষ্টিকুমড়া, পেঁপে, বাঁধাকপি বা ফুলকপি দিয়ে রান্না করলে মাংসের পরিমাণ কমে এবং আঁশ বাড়ে।

গ্রিল বা শিক কাবাব তুলনামূলক ভালো

আগুনে ঝলসে বা গ্রিল করে খেলে কিছু চর্বি গলে বেরিয়ে যায়।

গরুর মাংস কি সত্যিই “হাই কোলেস্টেরল”?

এই প্রশ্নটি নিয়েই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি রয়েছে।

পুষ্টিবিদরা বলছেন, গরুর মাংসের সব অংশে সমান কোলেস্টেরল থাকে না। চর্বিহীন মাংস তুলনামূলক নিরাপদ।

এমনকি একটি ডিমের কুসুমে থাকা কোলেস্টেরলের পরিমাণ অনেক সময় চর্বিহীন বড় পরিমাণ গরুর মাংসের সমান হতে পারে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু গরুর মাংস নয়, বরং অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস।

অতিরিক্ত গরুর মাংস খেলে কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন অতিরিক্ত গরুর মাংস খাওয়ার অভ্যাস শরীরে নানা জটিলতা তৈরি করতে পারে।

যেমন-

কোলেস্টেরল বৃদ্ধি

হৃদরোগ

উচ্চ রক্তচাপ

টাইপ-টু ডায়াবেটিস

স্থূলতা

কোষ্ঠকাঠিন্য

ত্বকের সমস্যা

আর্থ্রাইটিস

কিডনি জটিলতা

কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত লাল মাংস খাওয়ার সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্কও উল্লেখ করা হয়েছে।

কোরবানির ঈদ মানেই আনন্দ, ভাগাভাগি আর প্রিয়জনদের সঙ্গে খাবার টেবিলে বসার উৎসব। সেখানে গরুর মাংস থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আনন্দ যেন অসুস্থতার কারণ না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি।

ভুয়া ট্রাফিক জরিমানা নিয়ে বিআরটিএ-ডিএমপির সতর্কবার্তা

পরিমিত খাওয়া, কম চর্বি ব্যবহার, বেশি সবজি খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত হাঁটাচলা—এই কয়েকটি ছোট অভ্যাসই ঈদের খাবারকে অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পারে।

কারণ উৎসবের আসল আনন্দ সুস্থ থাকাতেই।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Md Elias is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency across digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and reader-focused reporting.