সাধারণ ব্যথার ওষুধের মতো সাধারণ ব্লিস্টার প্যাকে আফ্রিকায় ঢুকছে ভারতীয় ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট। পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর রাস্তার পাশের দোকান ও ফার্মেসিতে খোলাখুলি বিক্রি হচ্ছে এই প্রাণঘাতী সিন্থেটিক ওপিওয়েড। ভারত থেকে লাখ লাখ ট্যাবলেট আসছে, যা এখন ‘জম্বি ড্রাগ’ কুশের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) এএফপির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিশ্বের কোনো ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাই এই ট্যাবলেট অনুমোদন দেয়নি। তবু এএফপির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভারত সরকার বাণিজ্য বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিলেও দেশটির কোম্পানিগুলো নিয়মিত বিপুল পরিমাণে ট্যাপেন্টাডল পাঠিয়ে যাচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকায়। কিছু চালানের প্যাকেটে স্পষ্ট লেখা থাকে,’মানুষের ব্যবহারের জন্য ক্ষতিহীন ওষুধ।’
শুল্কের নথি অনুসারে, প্রতি মাসে নাইজেরিয়া, সিয়েরা লিওন, ঘানাসহ বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি ডলারের ট্যাপেন্টাডল যাচ্ছে। অথচ এসব দেশে ওষুধটির কোনো মাত্রাই অনুমোদিত নয়। ধনী দেশগুলোতে ওপিওয়েডজনিত মৃত্যুর পর কড়াকড়ি বাড়ায় ভারতীয় জেনেরিক কোম্পানিগুলো এখন আফ্রিকার দিকে ঝুঁকেছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর: কুশের সঙ্গে মিশছে ট্যাপেন্টাডল
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কুখ্যাত ‘জম্বি ড্রাগ’ কুশের সঙ্গে এখন ট্যাপেন্টাডল মেশানো হচ্ছে। সিয়েরা লিওন ও লাইবেরিয়ায় এ নিয়ে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
সিয়েরা লিওনের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক আনসু কোনেহ বলেন, ‘এটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রতিদিন রাস্তা, বাজার ও বস্তি থেকে লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে। শুধু রাজধানী ফ্রিটাউনে তিন মাসে ৪০০-র বেশি মরদেহ পাওয়া গেছে।’
স্থানীয় গবেষক রোনাল্ড আবু বানগুরা জানান, ব্যবহারকারীরা ট্যাবলেট গুঁড়ো করে কুশের সঙ্গে মিশিয়ে খাচ্ছে। এখন সব জায়গায় ট্যাপেন্টাডলের অপব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশটির অনানুষ্ঠানিক ডিটক্স সেন্টারগুলোতে আসক্তদের মাসের পর মাস শিকলে বেঁধে রাখা হয়। কোনেহ বলেন, সরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রে ভর্তি ৯০ শতাংশ রোগীই ট্যাপেন্টাডল মেশানো কুশ সেবন করতেন।
ভারতের নিষেধাজ্ঞার পরও চলছে রপ্তানি
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান ঘোষণা করে। কিন্তু এএফপির শিপমেন্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এরপরও প্রতি মাসে কোটি কোটি ডলারের উচ্চমাত্রার (২২৫ ও ২৫০ মিলিগ্রাম) ট্যাপেন্টাডল আফ্রিকায় যাচ্ছে।
জব্দ হওয়া ট্যাবলেটের লাইসেন্স নম্বর মিলিয়ে দেখা গেছে গুজরাটের গুজরাট ফার্মাসিউটিক্যালস, মেরিট অর্গানিকস, ম্যাকডব্লিউ হেলথকেয়ার এবং পিআরজি ফার্মার সঙ্গে। এসব কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার পরও চালান পাঠিয়েছে। একটি কোম্পানি চালানে ‘মানুষের ব্যবহারের জন্য ক্ষতিহীন ওষুধ’ লিখে পাঠিয়েছে।
ভারতের ইন্ডিয়ান ড্রাগ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন বলছে, বৈধ উৎপাদকের দায়িত্ব শুধু উৎপাদন পর্যন্ত। কিন্তু আফ্রিকার দেশগুলো বলছে, ট্যাপেন্টাডল সেখানে সম্পূর্ণ অবৈধ।
দারিদ্র্য আর কঠিন শ্রমের সুযোগ নিচ্ছে ড্রাগ
আফ্রিকার অনেকে নেশার জন্য নয়, বরং অমানবিক পরিশ্রম চালিয়ে যেতে এই ট্যাবলেট খাচ্ছেন। মোটরসাইকেল ট্যাক্সি চালক, কুলি, স্বর্ণখনির শ্রমিকরা ব্যথা ভুলতে ও শক্তি পেতে এটি ব্যবহার করছেন।
নাইজেরিয়ায় গাঁজার পর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক এখন ওপিওয়েড। দেশটির মাদকবিরোধী সংস্থা জানিয়েছে, অপহরণকারী, সন্ত্রাসী ও দস্যুরাও এটি ব্যবহার করে। বোকো হারামের যোদ্ধারাও সাধারণত ‘সাহস’ পেতে খায়।
শিশুরাও আসক্ত হচ্ছে
সিয়েরা লিওনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরাও এখন ট্যাপেন্টাডল খাচ্ছে। তারা বড়ি ভেঙে এনার্জি ড্রিংকের সঙ্গে মিশিয়ে খায়।
মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান আনসু কোনেহ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, আসক্তরা নিজেরাও বুঝতে পারে না যে ট্যাপেন্টাডলও তাদের জন্য ভয়ংকর। তারা বলে, কুশ ছেড়ে দিয়েছি, শুধু ট্যাবলেট খাই।’
দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা দেশগুলোতে এখন নতুন করে মাদকের ছায়া ঘনিয়ে উঠছে। ভারতীয় কোম্পানিগুলোর এই আগ্রাসী বাণিজ্য আফ্রিকায় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


