কুকুরের আতংক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়, হাসপাতালগুলোতে মিলছে জলাতংক ভ্যাকসিন। এমন কি অতিরিক্ত দাম দিলেও ফার্মেসিতে পাওয়া যাচ্ছে না তা।

রতনেশ্বর কুমার পেশায় একজন রাজমিস্ত্রি। প্রতিদিনেরমত ২২ এপ্রিল কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়েই পাগলা কুকুরের খপ্পড়ে পড়েন। কুকুড় কামড়িয়ে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ক্ষত বিক্ষত করে। পারিবারের সদস্যরা প্রথমে তাকে নিয়ে যান সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ কমপ্লেক্সে। সেখানে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ভ্যাকসিন না থাকায় নিয়ে যাওয়া হয় জেলা সদর হাসপাতালে। সেখানেও ছিলো না ভ্যাকসিন শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়-ঝাপ। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পর চড়া দামে একটি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে দেয়া হয় তাকে। জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর (৮ মে) রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান চিকিৎসাধীন রতনেশ্বর কুমার।
রতনেশ্বরের ভাই রবিন্দ্র কুমার অভিযোগ করেন, ‘কুকুর কামড়ানোর পরপরই ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ক্ষতস্থানগুলো ড্রেসিংয়ের পর জানানো হয় ভ্যাকসিন নেই। এরপর জেলা হাসপাতালে ছুটে যাই, সেখানেও একই কথা। বাধ্য হয়ে ওষুধের দোকান, বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। কিন্তু কোথাও ভ্যাকসিন মেলেনি।’ সময়মত ভ্যাকসিন পেলে ভাই বেঁচে যেতো বলে তার বিশ্বাস।
পরিবারের সদস্যদের দাবিও একই রকম, তারা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা না হলে হতে পারে আরও প্রাণহানি। আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই কেটে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করলেও ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে র্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।
শুধু কি রতনেশ্বর একা? তা নয়, সেই সময়ের ৮৪ ঘণ্টায় একই পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া।
গত ২২ এপ্রিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি ও কঞ্চিবাড়ি গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী ছাপরহাটী ইউনিয়নের মন্ডলেরহাট গ্রামে ঘটে এসব ঘটনা । বেওয়ারিশ কুকুরের কামড়ে এসব ঘটনায় দুই শিশু ও দুই নারীসহ মোট ১৫ জন গুরুতর আহত হন।
র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬ মে মারা যান কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫) ও কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে ফুলু মিয়া।
আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। নারী-শিশুসহ ৯ জন আহতাবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।
মন্ডলেরহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানালেন, ‘মানুষ হাসপাতালে ছুটে যায়, কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। এখন তিনজন মারা গেছে, আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’ কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজরুল ইসলাম মনে করিয়ে দেন, জলাতঙ্কে তার এলাকায় দুজন মারা গেছেন। ‘ভ্যাকসিন না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়নি। সরকারি হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকত, এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাক জানান, ‘আমাদের এখানে আক্রান্তদের কেউ চিকিৎসা নেয়নি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ ছিল না। এ মাসে ৩০টি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। এসব ভ্যাকসিন জেলা হাসপাতালগুলোয় সরবরাহ করা হয়।’
আরও পড়ুনঃ
গাইবান্ধা জেলা সিভিল সার্জন রফিকুজ্জামান , ঘটনা সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, কয়েক মাস থেকে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না বিষয়টি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদা দিয়েছি, তিনি আরও বলেন কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড়ে আহত হলে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো ভ্যাকসিন নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুরের ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


