“এক মণ পেজ ঘরে তুলতি প্রায় ১৫শ টাকা খরচ হইছে। আর বিক্রি হচ্ছে ৬শ-৭শ টাকায়। এতে তো অনেক লস যাচ্ছে আমাদের।”

রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে পেঁয়াজের ন্যায্য দাম না পেয়ে ক্ষোভে হড়াই নদীর পানিতে সেগুলো ফেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন এক কৃষক।
মঙ্গলবার উপজেলার সোনাপুর বাজার সংলগ্ন সেতুর ওপর থেকে নদীতে এসব পেঁয়াজ ফেলেন কৃষক পলাশ মিয়া। পরে এ ঘটনার ভিডিও বুধবার দুপুর থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
১ মিনিট ৪০ সেকেন্ড দীর্ঘ ভিডিওতে দেখা যায়, সেতুর রেলিংয়ের পাশে পেয়াজের বস্তা ভর্তি একটি ভ্যানের ওপরে উঠেছেন একজন ব্যক্তি। এরপর ভ্যানে থাকা বস্তার রশি খুলে পেঁয়াজ নদীর পানিতে ফেলে দিচ্ছেন তিনি।
এ সময় যে কৃষক মোবাইলে ভিডিও ধারণ করছেন তাকে পেঁয়াজ ফেলে দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে শোনা যায়।
নিজের ভাষায় তিনি বলেন, “এই যে পেজ পানিতে ফেলে দিতিচি।পেজ ফেলে দিয়ে খালি বস্তা নিয়ে যাতিছি। যে দাম কয় তাতে কৃষকের পোষায় না এজন্নি পেজ পানিতে ফ্যালা দিয়ে যাতিচি।
তিনি আরও বলেন, “কৃষকের মনে অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট। এই দেহেন ভালো পেজ। আমরা পেজ ফ্যালা দিছি সোনাপুর ব্রীজির পর। এই দেহেন পানিতে ভাসে যাচ্ছে। কৃষক ম্যালা কষ্টে পেজ ফ্যালা দিচ্ছে, হাটে পেজ চলতেছে না। সোনাপুর বাজারে মঙ্গলবারের দিন।”
এরপর ভিডিওতে নদীর পানিতে পেয়াজগুলো ভেসে যেতেও দেখা যায়।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর খবর নিয়ে জানা যায় ভুক্তভোগী ওই কৃষকের নাম পলাশ মিয়া। তিনি বালিয়াকান্দি উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের হলুদবাড়িয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাক মিয়ার ছেলে।
বৃহস্পতিবার তার সঙ্গে কথা হয়।
এ বছর ১০ বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে, ভালো ফলন পেয়েছেন জানিয়ে পলাশ মিয়া বলেন, “বাজারে তো পেজের দাম নাই। যহন পেজ মাঠ থেকে তুলি তহন ১ হাজার থেকে ১১শ টাকা মণ পেজ বিক্রি করছি। এহন আসে সেই পেজ ৬শ-৭শ টাকায় বিক্রি করা লাগতেছে।
“এক মণ পেজ ঘরে তুলতি প্রায় ১৫শ টাকা খরচ হইছে। আর বিক্রি হচ্ছে ৬শ-৭শ টাকায়। এতে তো অনেক লস যাচ্ছে আমাদের।”
পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেওয়া প্রসঙ্গে এ চাষি বলেন, “পেজের তো মেলা গ্রেড আছে। ভালো পেজ বিক্রি হচ্ছে ৮শ টাকা মণ। মঙ্গলবার আমি যে পেজ আনছিলাম বাজারে তা ছিলো বি গ্রেডের পেজ। যে কারণে বাজারে কোনো ব্যাপারি দামই কয় নাই। যে কারণে রাগে-দুঃখে ব্রিজের ওপর থেকে পেজ নদী ফেলে দিয়ে খালি বস্তা কয়ডা নিয়ে আসি।”
তিনটি বস্তায় চার মণ পেঁয়াজ ছিল বলেও জানান তিনি।
‘পিজ এহন বোঝার ওপর শাকের আঁটি’
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে বালিয়াকান্দি উপজেলার সোনাপুর পেঁয়াজ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ভোর থেকেই কৃষকেরা তাদের পেঁয়াজ বাজারে বিক্রির জন্য আনছেন। কেউ ভ্যানে, কেউ ইঞ্জিন চালিত নছিমনে।
স্থানীয় ব্যাপারিরা কৃষকের কাছ থেকে ক্রয় করা পেঁয়াজ তাদের শ্রমিক দিয়ে বস্তায় ভরে ট্রাকে করে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠিয়ে দিচ্ছে।
এ বাজারে মানভেদে প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মণ। দাম কম থাকায় অনেক কৃষকই তাদের পেঁয়াজ বিক্রি না করেই চলে যাচ্ছে।
পেঁয়াজের হাটে কথা হয় কৃষক আয়নাল শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, “কৃষক এবার একদম শ্যাষ। পিজির দাম নাই। এক বিঘেয় পিজি উৎপাদনে ম্যালা খরচ হয়ছে। সারের দাম বেশি, ত্যালের দাম বেশি, শ্রমিকের দাম বেশি। প্রতি বিঘেয় খরচ পড়ছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায়।
“আর যারা জমি শোনকারি নিছে তাদের তো আরও খরচ বেশি। এই দামে পিজি বেচে খরচ উটতেছে না।”
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক পেঁয়াজ চাষি কাশেম প্রামাণিক। তিনি বলেন, “পিজ এহন বোঝার ওপর শাকের আঁটি। একে তো মণ প্রতি তিন চারশ করে লস যাচ্ছে তার ওপর বাড়িতে সংগ্রহ করে রাকতে গেলেও খরচ বাড়তেছে।
“পিজ যাতে না পচে তার জন্য ঘরে ফ্যান লাগাইছি। বিদুতের দাম বাড়েচে ডাবল। আগে ৫শ টাকা লাগলি এহন লাগে ১ হাজার। তালি কন কোন দিক যাবো।”
আরেক কৃষক সুলতান বিশ্বাস বলেন, “যে দাম পাচ্চি আরবছর আমি পিজির আবাদ কম করবো। পিজি যদি লস যায় তালি সেতা তো করা যাবি না। সরকার ব্যাটারে কন আমাগে ইটু বাচাক। পিজির দাম ইটু বাড়ালি আমরা বাচপো না হলি শ্যাষ।”
কৃষকের ঘরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন পেঁয়াজ
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, এ বছর রাজবাড়ীতে পেঁয়াজের বাম্পার ফলন হয়েছে। পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। স্থানীয় জাতের পেঁয়াজ আবাদ না করে হাইব্রিড জাতের পেঁয়াজ আবাদ করায় উৎপাদন বেড়েছে।
তিনি বলেন, “এখনো কৃষকের ঘরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন পেঁয়াজ সংরক্ষণে আছে। বর্তমানে বাজারে দাম কম পাওয়ায় কৃষকদের মনটা খারাপ। সাথে সংরক্ষণ খরচও রয়েছে। আমি আশা করি সামনে পেঁয়াজের দাম বাড়বে, কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবে।”
রাজবাড়ী জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা নাঈম আহম্মেদ বলেন, “পেঁয়াজ নদীতে ফেলে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কোনো পণ্যের দাম নির্ধারণ করাটা চ্যালেঞ্জিং। সেক্ষেত্রে ডিমান্ড ও সাপ্লাইয়ের ওপরে মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে।
“কৃষি বিপণন অধিদপ্তর প্রতিবছর ন্যূনতম মূল্য বেঁধে দেয়। তবে এ বছর এখনো মূল্য নির্ধারণ করে দেয়নি।”
নাঈম আহম্মেদ আরও বলেন, “আমি মনে করি চাহিদার থেকে উৎপাদন যখন বেশি হয় তখন বাজারটা কমে যায়। এক্ষেত্রে কৃষকের বাজার বুঝে উৎপাদন করাটায় তাদের কমতি আছে। অতিরিক্ত উৎপাদন করেছে এবং চাষিরা সঠিক পেঁয়াজের জাত নির্বাচন না করায় তারা সংরক্ষণ করতে পারছে না।
তিনি বলেন, “কৃষক যদি উৎপাদনের আগে কৃষি অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সাথে যোগাযোগ করে উৎপাদন করে তাহলে তারা এ ধরণের ক্ষতি থেকে মুক্তি পাবে।”
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
পেয়াজ চাষিদের জন্য সরকার কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের জেলাতে সাড়ে ৫ হাজার ব্লোয়ার মেশিন দিয়েছে। সেটা দিয়ে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা সম্ভব। পাশাপাশি সরকার যদি উপজেলা পর্যায়ে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কালেকশন সেন্টার করে এবং টিসিবির মাধ্যমে সরকার যদি পেঁয়াজ ক্রয় করে তাহলে কৃষকেরা কিছুটা মুক্তি পাবে।”
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



