আজ পবিত্র শবে কদর। মুসলিম বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে মর্যাদাপূর্ণ এ রাত পালন করবেন। দিনগত রাত থেকেই শুরু হবে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ এই মহিমান্বিত রজনি।

মহান আল্লাহতায়ালা মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে পৃথিবীতে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। নবীদের পাঠানো বা নবুওয়ত শেষ হয়েছে প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে। নবীদের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালা নিজের পক্ষ থেকে আসমানী কিতাবও দিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে এই বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়’। (সূরা বাকারা, (২), আয়াত, ১২৯)
মানুষের মধ্যে যারা কাজেকর্মে সৎ হবে, তাদের জন্য রয়েছে অঢেল পুরস্কার এবং যারা কাজেকর্মে অসৎ হবে, তাদের জন্য থাকছে তিরস্কার। সৎকর্মের পরিচয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও সংসারজীবনের সব কাজেকর্মে সততা ও ন্যায়নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়া।
হাদিস থেকে জানা যায়, হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। কুরআন ও হাদীসের বর্ণনায় জানা যায়, ইসলামের চার জন নবী যথা আইয়ুব, জাকরিয়া , হিযকীল ও ইউশা ইবনে নূন প্রত্যেকেই আশি বছর স্রষ্টার উপাসনা করেন এবং তারা তাদের জীবনে কোন প্রকার পাপ কাজ করেননি। কিন্তু হজরত মুহাম্মদ (সা.) থেকে শুরু করে তার পরবর্তী অনুসারীগণের আয়ু অনেক কম হওয়ায় তাদের পক্ষে স্রষ্টার আরাধনা করে পূর্ববর্তীতের সমকক্ষ হওয়া কিছুতেই সম্ভপর নয় বলে তাদের মাঝে আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। তাদের এই আক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা দূর করার জন্য সূরা ক্বদর নাজিল করা হয়। সূরা কদর পবিত্র কোরআনের ৯৭তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ৫টি এবং এর রুকুর সংখ্যা ১টি। এই সূরাতে পবিত্র কোরআন নাজিলের কথা এবং হাজার রাতের থেকে উত্তম শবে কদরের কথা আলোচনা করা হয়েছে।
এই সূরার শানে নুজুল সম্পর্কে হজরত ইবনে আবী হাতেম -এর রেওয়ায়েতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার বনী ইসরাঈলের জনৈক মুজাহিদ সম্পর্কে আলোচনা করলেন। সে এক হাজার মাস পর্যন্ত অবিরাম জিহাদে মশগুল থাকে এবং কখনও অস্ত্র সংবরণ করেনি। মুসলমানগণ একথা শুনে বিস্মিত হলে এ সূরা কদর অবতীর্ণ হয়। এতে এ উম্মতের জন্যে শুধু এক রাতের ইবাদতই সে মুজাহিদের এক হাজার মাসের এবাদত অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে গণ্য করা হয়েছে।
আজ দিনগত রাতে পবিত্র শবে কদর। দিন শেষে সন্ধ্যা নামলেই শুরু হবে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠতম রজনি। পবিত্র এ রাতেই নবীজির ওপর অবতীর্ণ হয় পবিত্র কুরআন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি কুরআনকে নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। লাইলাতুল কদর সম্বন্ধে তুমি কী জান? লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম’ (সুরা কদর, আয়াত : ১-৩)।
ইসলাম ধর্মে শবে কদর বা লাইলাতুল কদর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতেই মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য পবিত্র কোরআন নাজিল করেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি কোরআনকে নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আর তুমি কি জান লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম।” (সূরা কদর, আয়াত ১–৩)।
ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, এ রাতে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং বান্দাদের জন্য রহমত, মাগফিরাত ও শান্তির বার্তা নিয়ে আসেন। ফজর পর্যন্ত এ রহমতের ধারা অব্যাহত থাকে।
‘শবে’ শব্দটি ফারসি, যার অর্থ রাত এবং ‘কদর’ অর্থ মর্যাদা বা সম্মান। আরবিতে এই রাতকে বলা হয় ‘লাইলাতুল কদর’। মুসলমানদের কাছে এটি ভাগ্য নির্ধারণের রাত হিসেবেও বিবেচিত। অনেক আলেমের মতে, এই রাতে মানুষের পরবর্তী বছরের বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করা হয়।
ইসলামি সূত্র অনুযায়ী, লাইলাতুল কদর রমজান মাসের শেষ দশকের কোনো এক বেজোড় রাতে হয়ে থাকে। অর্থাৎ ২১, ২৩, ২৫, ২৭ বা ২৯ রমজানের রাতের যেকোনো একটি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে ২৭ রমজানের রাতকে শবে কদর হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পালন করা হয়।
ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ী, এ রাতে মুসলমানরা নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, ইস্তেগফার ও বিশেষ দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করেন। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি নিজেও এ সময় ইতিকাফ ও অধিক ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।
হাদিসে হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দোয়াকে লাইলাতুল কদরের বিশেষ দোয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দোয়াটি হলো—
“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।”
অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন; অতএব আমাকে ক্ষমা করে দিন।’
ধর্মীয় বিশ্লেষকদের মতে, কোরআন নাজিলের কারণে এ রাতের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই এই রাতকে ঘিরে মুসলমানদের মধ্যে ইবাদত-বন্দেগি, তওবা ও আত্মশুদ্ধির বিশেষ পরিবেশ তৈরি হয়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, শবে কদরের প্রকৃত তাৎপর্য হলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন পরিচালনা করা এবং আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করা। এই রাতের বরকত ও ফজিলত লাভের জন্য মুসলমানদের আন্তরিকভাবে ইবাদত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


