২০৩০ সালের মধ্যেই বিশ্ব নতুন রেকর্ড গড়া উষ্ণতম বছরের মুখোমুখি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। সংস্থাটি বলছে, জলবায়ু সংকটের তীব্রতা বাড়তে থাকায় পৃথিবীর তাপমাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চলতি দশকেই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও বেড়ে যেতে পারে এবং ২০২৭ সালেই ভেঙে যেতে পারে বিশ্বের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড।
জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে ক্রমাগত বাড়ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ। এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখছে, যার কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ, খরা, ঝড় ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়া আরও ঘন ঘন ও তীব্র হয়ে উঠছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে দেখা দেওয়া ভয়াবহ তাপপ্রবাহকেও জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।
বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানবজীবনের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে প্রতি মিনিটে অন্তত একজন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। দ্রুত কার্বন নিঃসরণ কমানো না গেলে এই মৃত্যুহার আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তরের সহায়তায় তৈরি ডব্লিউএমওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে অন্তত একটি বছর ২০২৪ সালের চেয়েও বেশি উষ্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৮৬ শতাংশ। একই সময়ে পাঁচ বছরের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ।
জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিল বলেন, “ইউরোপের সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহ জলবায়ু সংকটের ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের নির্মম স্মারক। ভারতসহ এশিয়ার আরও অনেক অঞ্চলও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “চরম তাপদাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি থেকে মানুষ, অর্থনীতি ও ব্যবসাকে রক্ষা করা এখন প্রতিটি দেশের প্রধান দায়িত্ব। আর এজন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো জরুরি।”
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে আরও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, খরা, ঝড় ও বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। তবে উষ্ণতা যতটুকু নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে, ক্ষতির মাত্রাও ততটাই কমানো সম্ভব হবে।
প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও সেটি অর্জন এখন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তবে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে পরিস্থিতি ধরে রাখা এখনো সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডব্লিউএমওর তথ্যমতে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কোনো একক বছরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ১ শতাংশেরও কম।
বিশ্ব তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে এল নিনো। প্রশান্ত মহাসাগরের বাতাসের পরিবর্তনের কারণে সাগরে জমে থাকা তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়লে এই আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনো হওয়ার সম্ভাবনা ৯৬ শতাংশ। এর মধ্যে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’র সম্ভাবনাও রয়েছে ৩৫ শতাংশ।
ডব্লিউএমওর প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড. লিওন হারম্যানসন বলেন, “২০২৬ সালের শেষ দিকে এল নিনো দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা ২০২৭ সালকে নতুন রেকর্ড গড়া উষ্ণতম বছর হওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে আর্কটিক অঞ্চলের শীতকাল সাম্প্রতিক গড়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ হতে পারে। অর্থাৎ অঞ্চলটি বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
এ ছাড়া বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তনের আভাস দিয়েছে ডব্লিউএমও। আগামী পাঁচ বছরে মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে উত্তর ইউরোপ, সাহেল অঞ্চল, আলাস্কা ও সাইবেরিয়ায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। অন্যদিকে অ্যামাজন অঞ্চলে খরার প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



