জাহিদ ইকবাল : বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে এক বিশেষ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত—ক্ষমতা মানেই ভিআইপি প্রটোকল, আলাদা সুবিধা এবং সাধারণ মানুষ থেকে দৃশ্যমান দূরত্ব। অনেকেই ভাবতেন, রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছালে স্বাভাবিক জীবন চলে আসে দূরত্বের সঙ্গে, এবং সেই দূরত্বই ‘ক্ষমতার স্বীকৃতি’।

তবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছেন, তা শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা, অপ্রয়োজনে রাস্তা বন্ধ না রাখা
শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা প্রত্যাখ্যান
সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারে সংযম
এসব পদক্ষেপ প্রতীকী হলেও, ক্ষমতাকে সরাসরি জনগণের কাছে নিয়ে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়। এটি প্রমাণ করে যে ক্ষমতা ব্যবহারে ‘জনসেবার মানসিকতা’ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ভিআইপি চলাচলে দীর্ঘ যানজট, জনদুর্ভোগ ও নিরাপত্তার নামে কঠোর প্রটোকল বহুদিনের বাস্তবতা। অথচ নিউজিল্যান্ড, সুইডেন, কানাডার মতো গণতান্ত্রিক দেশে সরকারপ্রধানরা স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও জনগণের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখেন। সেখানে সরলতা দুর্বলতা নয়; বরং রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ।
ইতিহাস প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রনেতার সময় ও চ্যালেঞ্জ আলাদা হয়।
জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির সময়ে প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভিন্নধর্মী নেতৃত্বের ছাপ রেখেছেন।
খালেদা জিয়া বহুবার নির্বাচিত হয়ে জনপ্রিয়তার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণ তাৎক্ষণিক ফলাফল চায় এবং প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল দেখতে চায়।
শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বর্জনের ঘোষণা রাজনৈতিক নৈতিকতার দৃঢ় বার্তা। জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজস্ব সুবিধার জন্য দায়িত্বের বাইরে চলে যান, জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়। তবে এই নীতি যদি আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে এটি স্থায়ী সংস্কারের দিকে ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে।
নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নের দিকেও বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী—নির্বাচনী প্রচারণায় পরিবারে নারীর স্বাধীন অংশগ্রহণ প্রতীকী বার্তা দিলেও, সংসদ, স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনে নারীর কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করা সত্যিকারের সামাজিক ভারসাম্য আনবে।
অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জও বড়—মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ। প্রতীকী সরলতা একা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দুর্নীতি দমন, কর কাঠামোর সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও প্রশাসনিক দক্ষতা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান ধরে রাখতে হলে সুশাসন ও নীতিগত স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সরকারের আত্মবিশ্বাসের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সমালোচনার প্রতি ধৈর্য্য, স্বচ্ছতা এবং তথ্যের যথাযথ প্রমাণ জনআস্থা বাড়ায়।
ইতিহাস বলছে—জনপ্রিয়তা অর্জন কঠিন, ধরে রাখা আরও কঠিন। জনগণ ভোট দিয়েছে প্রত্যাশার ভিত্তিতে। দু’এক মাসের মধ্যে তারা হিসাব চাইবে; বিরোধীরা সমালোচনা করবে; প্রচারযুদ্ধ চলবে। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান যত কম হবে, আস্থার ভিত্তি তত শক্ত হবে।
সংক্ষেপে:
প্রতীকী সরলতা যদি সুশাসনের ধারাবাহিকতায় রূপ পায়, নারীর অংশগ্রহণ কাঠামোগত শক্তিতে পরিণত হয়, অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ থাকে—তাহলে সত্যিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস লেখা সম্ভব। এখন সময় কথা নয়, কাজের প্রমাণ দেখানোর।
লেখক পরিচিত: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


