জাহিদ ইকবাল : ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সুখ ভাগাভাগি করার সময়। কিন্তু দেশের অনেক সাংবাদিকের জন্য এই ঈদও হয়ে উঠেছে বঞ্চনা, হতাশা আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করেও তারা যখন ঈদের আগে ন্যায্য বেতন-ভাতা ও বোনাস থেকে বঞ্চিত হন, তখন সেটি শুধু আর্থিক সংকট নয়—পেশাগত অপমানেরও নামান্তর।

ঈদে আনন্দহীন সাংবাদিক

Advertisement

চলতি বছরও ব্যতিক্রম হয়নি। বহু গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকরা ঈদের আগে পূর্ণ বেতন তো দূরের কথা, আংশিক পরিশোধ কিংবা সম্পূর্ণ বকেয়া অবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ কেউ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশায় থেকেছেন—হয়তো ঈদের আগের দিন কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই আশাও অনেক ক্ষেত্রে ভঙ্গ হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিস্থিতি কেন বারবার ফিরে আসে?

প্রথমত, গণমাধ্যম মালিকদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়ে আসছে। শ্রম আইন, ওয়েজ বোর্ড কিংবা নৈতিক বাধ্যবাধকতা—সবকিছুকেই তারা উপেক্ষা করছে। সাংবাদিকদের শ্রমকে তারা যেন ‘ঐচ্ছিক ব্যয়’ হিসেবে বিবেচনা করে। অথচ একই প্রতিষ্ঠানে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের কোনো কমতি দেখা যায় না। এই বৈষম্য শুধু অন্যায় নয়, এটি সুস্পষ্ট শোষণ।

তবে মালিকপক্ষের এই অবহেলা যতটা দায়ী, তার চেয়ে কম দায়ী নয় সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো। একটি পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান কাজই হলো সদস্যদের অধিকার রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলেও ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো আন্দোলন, প্রতিবাদ বা চাপ সৃষ্টির উদ্যোগ নেই। এই নীরবতা কেবল ব্যর্থতা নয়, এটি এক ধরনের দায়িত্বহীনতা।

আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—অনেক সাংবাদিক সংগঠন আজ রাজনৈতিক দলের লেজুরভিত্তিক অঙ্গসংগঠনে পরিণত হয়েছে। তারা পেশার স্বার্থের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য প্রদর্শনে বেশি আগ্রহী। এই সংস্কৃতি সাংবাদিক সমাজের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কারণ, যখন একটি সংগঠন দলীয় প্রভাবের কাছে নতজানু হয়, তখন সেটি আর সদস্যদের ন্যায্য দাবির পক্ষে দাঁড়াতে পারে না।

সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে অবশ্যই দলনিরপেক্ষ থাকতে হবে। তাদের অবস্থান হবে স্পষ্ট—সাংবাদিকের অধিকার, ন্যায্য প্রাপ্য এবং পেশাগত মর্যাদার পক্ষে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা বা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি এই সংগঠনগুলোর অস্তিত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি।

বর্তমানে আমরা এমন এক পরিস্থিতি দেখছি, যেখানে সাংবাদিকদের প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আনুষ্ঠানিক শুভেচ্ছা, ছবি পোস্ট কিংবা প্রতীকী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকলেও, বাস্তব সংকটে সাংবাদিকদের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য খুব কমই দেখা যায়। এটি শুধু হতাশাজনক নয়, বরং সদস্যদের প্রতি অবহেলার প্রকাশ।

একসময় সাংবাদিক কল্যাণমূলক উদ্যোগগুলো ছিল সংগঠনের অন্যতম শক্তি। ঈদ উপহার, সহায়তা কিংবা সংকটকালে পাশে দাঁড়ানো—এসবই পেশাজীবীদের মধ্যে সংহতি তৈরি করতো। কিন্তু এখন সেই চর্চা কমে গেছে। ঢাকার বড় সংগঠনগুলো যেখানে নিষ্ক্রিয়, সেখানে জেলা পর্যায়ের ছোট সংগঠনগুলো সীমিত সামর্থ্য নিয়েও সদস্যদের সহায়তা দিচ্ছে—এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, সমস্যা সামর্থ্যের নয়, সদিচ্ছার।

এছাড়া, কিছু সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা আরও উদ্বেগজনক। সংগঠনের অফিস যদি সদস্যদের অধিকার আদায়ের কেন্দ্র না হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জায়গায় পরিণত হয়, তবে সেটি শুধু অনৈতিক নয়—সংগঠনের চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ। এই প্রবণতা বন্ধ না হলে সংগঠনের প্রতি আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

এই বাস্তবতায় একটি স্পষ্ট প্রশ্ন সামনে আসে—সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো কি তাদের মৌলিক দায়িত্ব পালন করছে? যদি না করে, তবে তাদের প্রয়োজনীয়তা কোথায়? একটি সংগঠন শুধু নামের জন্য থাকতে পারে না; তার কার্যকারিতা থাকতে হবে, জবাবদিহি থাকতে হবে।

সমাধানের পথ অবশ্যই আছে, যদি ইচ্ছা থাকে। প্রথমত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে প্রকৃত পেশাজীবী সংগঠনে রূপান্তর করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বেতন-ভাতা বকেয়া থাকলে তা আদায়ে দৃশ্যমান ও কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, সংগঠনের নেতৃত্বে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সাংবাদিকদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। নিজেদের অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধ না হলে, কোনো সংগঠনই কার্যকর হয়ে উঠবে না। নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দায়িত্বও সদস্যদের ওপরই বর্তায়।

সাংবাদিকতা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সেই ভিত্তির কর্মীরা যদি বারবার বঞ্চিত হন, তবে এর প্রভাব গোটা সমাজের ওপর পড়ে। ঈদের মতো আনন্দের সময়ে যখন সাংবাদিকদের ঘরে হতাশা নেমে আসে, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

এই ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না—না মালিকপক্ষ, না সরকার, না সাংবাদিক ইউনিয়ন। এখনই সময় দায় স্বীকার করে বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটার। অন্যথায়, ‘ঈদে আনন্দহীন সাংবাদিক’—এই বাস্তবতা আমাদের লজ্জার ইতিহাস হয়ে থাকবে।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.