বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সব নথিপত্র আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক দলের সদস্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিক।

শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুতে আয়োজিত নাগরিক শোকসভায় চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ দাবি জানান।
ডা. এফ এম সিদ্দিক তার বক্তব্যে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় চরম অবহেলার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের ২৭ এপ্রিল কোভিড-১৯–এর জটিলতা নিয়ে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর বর্তমান মেডিকেল বোর্ড তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। ভর্তি হওয়ার পরপরই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা দেখতে পান যে, খালেদা জিয়া লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত। অথচ বিএসএমএমইউ থেকে দেওয়া চিকিৎসার ছাড়পত্রে তার জন্য আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় নিয়মিত ‘মেথোট্রেক্সেট’ সেবনের নির্দেশনা ছিল এবং হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন সময়েও তাকে এই ওষুধ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি জানার সঙ্গে সঙ্গে তারা ওষুধটি বন্ধ করে দেন।
তিনি আরও বলেন, বেগম খালেদা জিয়া রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে ভুগছিলেন এবং রিউমাটোলজিস্টদের পরামর্শেই তিনি মেথোট্রেক্সেট গ্রহণ করছিলেন। পাশাপাশি তার ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ছিল। ডা. সিদ্দিকের মতে, লিভারের এই সমস্যা শনাক্ত করা খুবই সহজ ছিল এবং এর জন্য উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ হওয়ারও প্রয়োজন ছিল না। মেথোট্রেক্সেট গ্রহণকারীদের নিয়মিত লিভার ফাংশন টেস্ট করা বাধ্যতামূলক এবং রিপোর্ট খারাপ হলে ওষুধ বন্ধ করে অন্তত একটি আল্ট্রাসনোগ্রাম করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি জানান, লিভার ফাংশন টেস্ট অস্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও সরকারি চিকিৎসকরা কোনো আল্ট্রাসনোগ্রাম করাননি এবং ওষুধটিও বন্ধ করা হয়নি।
চিকিৎসকদের প্রতি আস্থাহীনতার বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের ওপর আস্থা না থাকায় ম্যাডাম সেখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি করাতে রাজি হননি। তবে তার মতে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় তার আস্থাভাজন চিকিৎসকের মাধ্যমে বেডসাইডে আল্ট্রাসাউন্ড করানো যেতো। অন্তত ক্ষতিকর ওষুধটি বন্ধ করাই ছিল ন্যূনতম দায়িত্ব।
অনেকে বেগম খালেদা জিয়াকে ‘স্লো পয়জনিং’ করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্ন তোলেন উল্লেখ করে ডা. এফ এম সিদ্দিক বলেন, তার মতে মেথোট্রেক্সেটই সেই ওষুধ যা ফ্যাটি লিভার ডিজিজকে দ্রুত লিভার সিরোসিসে রূপান্তরিত করেছে। এই দিক থেকে এটি তার লিভারের জন্য কার্যত একটি ‘স্লো পয়জন’-এর মতো কাজ করেছে।
তিনি এই অবহেলাকে ‘ইচ্ছাকৃত চিকিৎসা অবহেলা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি একটি ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এমনকি এটি তাকে হত্যা করার সুদূরপ্রসারী কোনো পরিকল্পনার অংশ ছিল কি না—তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। তিনি আরও দাবি করেন, ডায়াবেটিস ও আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসাতেও গুরুতর অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মেডিকেল বোর্ডের কাছে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে তিনটি বিষয়ে গভীর তদন্তের দাবি জানান। প্রথমত, সরকার গঠিত মেডিকেল বোর্ডে কারা ছিলেন এবং কী যোগ্যতার ভিত্তিতে তারা চিকিৎসার দায়িত্ব পেয়েছিলেন, সেই দায়িত্ব পালনে তারা ব্যর্থ হয়েছেন কি না। দ্বিতীয়ত, হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন কোন কোন চিকিৎসক চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তাদের অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যায় কি না। তৃতীয়ত, চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া আইনজীবীর মাধ্যমে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও কেন তা সম্ভব হয়নি এবং কারা এতে বাধা সৃষ্টি করেছিলেন।
বক্তব্যের শেষাংশে ডা. এফ এম সিদ্দিক জোর দিয়ে বলেন, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে বিএসএমএমইউতে তার চিকিৎসা সংক্রান্ত সব নথিপত্র আইনগতভাবে জব্দ করা এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেবে। তার ভাষায়, “বিচার বিলম্বিত হলে বিচার অস্বীকৃত হয়।”
শোকসভায় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় সারাজীবন সংগ্রাম করা এই মানুষটি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তবে আজ তিনি নিজের চোখেই দেখতে পারতেন—মানুষ কীভাবে ভয়মুক্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


