ডাইনোসরের নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশালাকৃতির এক প্রাণীজগত, যারা একসময় পৃথিবীর একচ্ছত্র শাসক ছিল। প্রায় ১৬ কোটি বছরেরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীতে আধিপত্য বিস্তার করা এই প্রাণীগুলোর অস্তিত্ব নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হয়েছিল, বর্তমান রাশিয়ার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ডাইনোসরের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ধারণা বদলে দিয়েছে আধুনিক জীবাশ্ম গবেষণা।

সাইবেরিয়ার বরফাচ্ছন্ন অঞ্চল, সুদূর প্রাচ্যের পাহাড়ি এলাকা এবং আমুর নদী অববাহিকার বিভিন্ন স্থানে আবিষ্কৃত জীবাশ্ম আজ প্রমাণ করছে, কোটি কোটি বছর আগে রাশিয়ার ভূখণ্ডও ছিল ডাইনোসরদের বিচরণক্ষেত্র। বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২৩৩ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরদের আবির্ভাব ঘটে। সে সময় পৃথিবী বর্তমানের মতো বিভিন্ন মহাদেশে বিভক্ত ছিল না; বরং ‘প্যানজিয়া’ নামে একটি বিশাল সুপারমহাদেশের অংশ ছিল সব স্থলভাগ।
রাশিয়ায় ডাইনোসরের জীবাশ্ম অনুসন্ধান বরাবরই কঠিন ছিল। এর অন্যতম কারণ দেশটির বিশাল এলাকা ঘন বনভূমি ও চিরস্থায়ী বরফে আচ্ছাদিত। ফলে গবেষকদের জন্য খননকাজ পরিচালনা করা সহজ নয়। তবুও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে। এমনকি আমুর অঞ্চলের ব্লাগোভেশচেনস্ক শহরে আবাসন নির্মাণের সময় খননকাজে পাওয়া গেছে ডাইনোসরের অসংখ্য জীবাশ্ম, যা পরে একটি বিশাল ‘ডাইনোসর কবরস্থান’ হিসেবে পরিচিতি পায়।
রুশ বিজ্ঞানীরা এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ডাইনোসর প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন। এর মধ্যে ‘কুলিনডাদ্রোমিয়াস জাবাইকালিকাস’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এটি পালকযুক্ত ডাইনোসরদের অন্যতম প্রাচীন প্রতিনিধি বলে মনে করা হয়। এই আবিষ্কার ডাইনোসর ও আধুনিক পাখির মধ্যকার বিবর্তনীয় সম্পর্ক বোঝার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
অন্যদিকে ‘সিবিরোটিটান অ্যাস্ট্রোস্যাক্রালিস’ ছিল এক বিশাল তৃণভোজী ডাইনোসর, যার ওজন চারটি পূর্ণবয়স্ক হাতির সমান ছিল বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া ‘কাইলেস্কাস অ্যারিস্টোটোকাস’কে বিখ্যাত টি-রেক্সের প্রাচীন পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘সিটাকোসরাস সাইবেরিকাস’-এর মতো অদ্ভুত গড়নের ডাইনোসরও এই অঞ্চলে বিচরণ করত।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের মেরুপ্রবণ এলাকাগুলোতেও ডাইনোসরের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। চুকচি উপদ্বীপে পাওয়া ডিমের খোলস ও ডাইনোসর শাবকের হাড় থেকে ধারণা করা হয়, তীব্র ঠান্ডা পরিবেশেও কিছু প্রজাতি টিকে থাকতে সক্ষম ছিল।
জীবাশ্ম আবিষ্কার নিজেই একটি বিরল ঘটনা। বিজ্ঞানীদের মতে, কোনো প্রাণীর দেহাবশেষ জীবাশ্মে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণীর দেহ পচে যায় বা অন্য প্রাণীর খাদ্যে পরিণত হয়। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে কাদা বা পলির নিচে চাপা পড়ে থাকা দেহাবশেষ ধীরে ধীরে খনিজ পদার্থের প্রভাবে পাথরে রূপ নেয় এবং কোটি বছর ধরে সংরক্ষিত থাকে।
রাশিয়ার তুভা অঞ্চলে এমন কিছু জীবাশ্ম পাওয়া গেছে, যেগুলো প্রাকৃতিকভাবে তেজস্ক্রিয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এসব জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরের জীবনযাপন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানতে পারছেন। টমোগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার করে খুলির অভ্যন্তরীণ গঠন পরীক্ষা করে তাদের শ্রবণক্ষমতা, খাদ্যাভ্যাস এবং আচরণ সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
ডাইনোসর সম্পর্কে মানুষের প্রচলিত অনেক ধারণাও সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে। একসময় মনে করা হতো তারা ছিল শীতল রক্তের এবং আঁশে ঢাকা সরীসৃপ। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অধিকাংশ ডাইনোসরই সম্ভবত উষ্ণ রক্তের ছিল এবং অনেক প্রজাতির শরীরে রঙিন পালকও ছিল। ফলে আধুনিক পাখিদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখন বৈজ্ঞানিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত।
প্রায় ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবী থেকে অ-পাখি ডাইনোসরদের বিলুপ্তি ঘটলেও তাদের গল্প শেষ হয়ে যায়নি। রাশিয়ার মাটির গভীরে লুকিয়ে থাকা জীবাশ্মগুলো এখনও পৃথিবীর সুদূর অতীতের অসংখ্য অজানা অধ্যায় উন্মোচন করছে। প্রতিটি নতুন আবিষ্কার শুধু ডাইনোসর নয়, পৃথিবীর বিবর্তনের ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন তথ্য তুলে আনছে।
রাশিয়ার বরফ, বন আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরের নিচে তাই এখনও হয়তো ঘুমিয়ে আছে কোটি বছরের পুরোনো আরও অনেক রহস্য, যা ভবিষ্যতের গবেষণায় নতুন করে বিস্মিত করবে বিশ্বকে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



