দেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে চলছে টানাপোড়েন। তহবিল সংকটের কারণে বাড়ছে ঋণ ও ধারকর্জের চাপ। জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে জনজীবন ও অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে অস্থিরতা। এই পরিস্থিতিতে সরকার যখন সর্বস্তরে ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্রসাধনের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতি

Advertisement

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা চুক্তির ভিত্তিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের বোঝা সরকারের ওপর চাপাতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অথচ আগের কেনা ১০টি বোয়িং উড়োজাহাজের সম্পূর্ণ অর্থ এখনো পরিশোধ হয়নি। এ অবস্থায় এমন ব্যয়বহুল কেনাকাটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে জ্বালানি সংকটে যানবাহন স্থবির, কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রম ব্যাহত, অন্যদিকে সরকারি ব্যয় কমানোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের বড় অঙ্কের ব্যয় সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশ বর্তমানে বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার কারণে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা কয়েক বছর প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, বিনিয়োগ স্থবিরতা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ধীরগতি এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতির গতি দুর্বল হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বৈদেশিক বাণিজ্য ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি বাড়ছে।

এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের জরুরি ঋণ চেয়েছে সরকার। এর মধ্যেই প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের বোয়িং কেনার পরিকল্পনা রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডাউন পেমেন্ট হিসেবে কয়েক হাজার কোটি টাকা জোগাড় করাও চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সরকার ইতোমধ্যে ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে যানবাহন ও কম্পিউটার কেনা, সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরসহ ১১টি খাতে বরাদ্দ সীমিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তকে অনেকে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মডেলের ড্রিমলাইনার ও ম্যাক্স সিরিজের উড়োজাহাজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অর্থ ২০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করা হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদ ও ডলারের বিনিময় হার পরিবর্তনের কারণে বার্ষিক পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, উড়োজাহাজ পরিচালনার খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ এবং যন্ত্রাংশের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় যুক্ত হলে প্রকৃত চাপ আরও বেশি হবে। অন্যদিকে, বিমানের বর্তমান আয় সেই তুলনায় সীমিত।

এই চুক্তির পেছনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ভারসাম্য রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক চাপ মোকাবেলার কৌশলও কাজ করছে বলে জানা গেছে। তবে সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বড় আর্থিক দায় দেশের দুর্বল অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।

ইউরোপীয় কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা সতর্ক করে বলেছেন, শুধু একটি নির্দিষ্ট নির্মাতার উড়োজাহাজের ওপর নির্ভর করলে ইউরোপীয় বাজারে বাণিজ্য সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে, এয়ারবাস কোম্পানি বলছে, তারা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য পায়নি।

বিমানের বর্তমান বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। কয়েকটি উড়োজাহাজ ফেরত গেলে সংখ্যা আরও কমে যাবে। সরকার ভবিষ্যতে বহর বাড়িয়ে ৩০ থেকে ৪৭টি পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় উড়োজাহাজের চেয়ে আঞ্চলিক ও স্বল্প দূরত্বের রুটের জন্য ছোট উড়োজাহাজ বেশি কার্যকর হতে পারে।
সব মিলিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, ধাপে ধাপে পরিকল্পনা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। নইলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.