ডা. এম মাহিদুল ইসলাম জিহাদ : বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোট রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের একটি ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের এমন সুযোগ বিরল। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকে ঘিরে ইচ্ছাকৃত অপতথ্য, বিভ্রান্তি ও ভয়ভিত্তিক প্রচারণা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী গণভোটকে কেন্দ্র করে ভিত্তিহীন আশঙ্কা ও ভয় প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। কোথাও বলা হচ্ছে গণভোটের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্ন হবে, কোথাও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা ছড়ানো হচ্ছে। বাস্তবে এসব বক্তব্যের কোনোটি গণভোটের ঘোষিত প্রশ্ন, আইনি কাঠামো কিংবা সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং এগুলো পরিকল্পিতভাবে জনগণকে বিভ্রান্ত করে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা।
গণভোটের উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কারসমূহ সম্পর্কে জনগণের সম্মতি বা অসম্মতি নির্ধারণ করাই এর মূল লক্ষ্য। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি দেওয়া, যা ভবিষ্যতে সংসদীয় ও আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত করবে। আর ‘না’ ভোট মানে এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামো বহাল রাখা। এর বাইরে কোনো গোপন শর্ত, নাগরিক অধিকার হরণের সুযোগ কিংবা রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রশ্ন নেই।
তবুও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। গণভোটকে বিতর্কিত ও ভীতিকর করে তোলার এই প্রবণতা গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাবিরোধী। কারণ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো তথ্যভিত্তিক মতামত গঠন এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। জনগণকে ভুল তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করা হলে তা রাজনৈতিক মতভিন্নতার গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি গভীর গণতান্ত্রিক সংকটে রূপ নেয়।
এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণভোট সংক্রান্ত সঠিক ও নির্ভরযোগ্য তথ্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা শনাক্ত করা এবং ইচ্ছাকৃত অপতথ্যের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন ও গণভোট—উভয় প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় প্রশাসনিক নীরবতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
একই সঙ্গে নাগরিকদের প্রতিও দায়িত্ব রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব, অসমর্থিত দাবি কিংবা দায়িত্বহীন বক্তব্য যাচাই না করে গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক সচেতনতার পরিপন্থী। গণভোট জনগণের সরাসরি মত প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম—এটি ভয়, বিভ্রান্তি বা অপপ্রচারের মাধ্যমে প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়।
গণতন্ত্রের শক্তি নিহিত রয়েছে জনগণের সচেতনতা, তথ্যভিত্তিক চিন্তা এবং বিবেকনির্ভর সিদ্ধান্তে। অপতথ্যের বিস্তার রোধে রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। আসন্ন গণভোট সেই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতারই একটি বড় পরীক্ষা। এখানে শেষ কথা বলবে জনগণ—তথ্য, যুক্তি ও বিবেকের আলোকে।
লেখক: আহ্বায়ক, জাগ্রত জুলাই সংসদ।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


