আজকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরতে গেলেই এক ধরনের উদ্বেগজনক দৃশ্য চোখে পড়ে। দূরপাল্লার বাসচালক থেকে শুরু করে ট্রেনের লোকোমাস্টার—অনেকেই এখন নিজেদের নিয়মিত কন্টেন্ট নির্মাতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। চলন্ত অবস্থায় এক হাতে স্টিয়ারিং ধরে অন্য হাতে মোবাইল ব্যবহার করা বা ড্যাশবোর্ডে ক্যামেরা বসিয়ে ভিডিও তৈরি করা তাদের জন্য যেন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সম্প্রতি এমনই একটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, একজন বাসচালক রাস্তায় ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং বাসটি রোড ডিভাইডারে গিয়ে ধাক্কা খায়। প্রযুক্তির এই যুগে মানুষ নিজের কাজ ও অভিজ্ঞতা সবার সামনে তুলে ধরতে চায়—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সেই কাজ শত শত মানুষের জীবনের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, তখন এ ধরনের কন্টেন্ট তৈরি ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
বাস বা ট্রেন চালানো কোনো সাধারণ কাজ নয়। এখানে প্রতিটি মুহূর্তে সর্বোচ্চ মনোযোগ ও সতর্কতা প্রয়োজন। রাস্তার পরিস্থিতি যেকোনো সময় বদলে যেতে পারে—হঠাৎ সামনে চলে আসতে পারে অন্য কোনো যানবাহন বা পথচারী। ঠিক এমন সময় যদি চালকের মনোযোগ রাস্তার পরিবর্তে ক্যামেরার দিকে থাকে, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বিজ্ঞানও বলছে, মানুষ একসঙ্গে একাধিক কাজে সমান দক্ষতা বজায় রাখতে পারে না। ড্রাইভ করার সময় ভিডিও করা বা লাইভ স্ট্রিমিং চালকের মনোযোগকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অনেক চালক নিজেদের অভিজ্ঞ ও দক্ষ মনে করে এমন ঝুঁকি নেন, কিন্তু অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসই অনেক সময় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাইক, মন্তব্য ও শেয়ারের আকর্ষণ এক ধরনের আসক্তি তৈরি করে। এই জনপ্রিয়তার লোভ অনেক সময় চালকদের পেশাগত দায়িত্ব ভুলিয়ে দেয়। তারা ভুলে যান যে, তাদের পেছনে বসে থাকা যাত্রীদের জীবনের দায়িত্ব তাদের হাতেই। সামান্য আয় বা কয়েকটি ভিউয়ের জন্য এই ধরনের ঝুঁকি নেওয়া আসলে নিজের ও অন্যের জীবনকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া।
সড়ক বা রেল দুর্ঘটনার সময় সাধারণত রাস্তার অবস্থা, যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য চালকের বেপরোয়া আচরণকে দায়ী করা হয়। কিন্তু চালকের মনোযোগ বিভ্রাটের এই নতুন কারণটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। যদি কেউ ভিডিও বানাতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটান, তবে তা নিছক ভুল নয়—বরং অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতার একটি উদাহরণ। এর ফলে ঘটে যাওয়া ক্ষতির দায়ভার তাকেই বহন করতে হবে।
এই সমস্যা সমাধানে কঠোর আইন ও তার সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। চালকদের ডিউটি চলাকালীন মোবাইল বা রেকর্ডিং ডিভাইস ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত। পাশাপাশি পরিবহন মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। চালকের কেবিনে ক্যামেরা স্থাপন করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
তবে শুধু শাস্তিই যথেষ্ট নয়, সচেতনতা বৃদ্ধি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালকদের বোঝাতে হবে, একটি ভিডিও বা লাইকের চেয়ে তাদের ও যাত্রীদের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। পরিবহন কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা। একইসঙ্গে যাত্রীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। যদি কখনো দেখা যায় চালক ভিডিও করতে ব্যস্ত, তাহলে নীরব না থেকে প্রতিবাদ করা এবং প্রয়োজনে জরুরি সেবায় অভিযোগ জানানো উচিত।
কন্টেন্ট তৈরি করা বা নিজের শখ পূরণ করা ভুল কিছু নয়, তবে তা হওয়া উচিত অবসরের সময়। দায়িত্ব পালনের সময়, বিশেষ করে যখন তা মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িত, তখন পেশাদারিত্বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্টিয়ারিং বা ট্রেনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ কখনোই বিনোদনের জায়গা হতে পারে না। এই বাস্তবতা সবাই উপলব্ধি করলে দুর্ঘটনা কমবে এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


