জাহিদ ইকবাল : বাংলাদেশের গণমাধ্যম নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—সাংবাদিকতা কি জনগণের জন্য, নাকি ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার জন্য? সাম্প্রতিক সময়ে মুহাম্মদ ইউনূস-কে ঘিরে কিছু গণমাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও মন্তব্য এই প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে কেবল মতামত বা সমালোচনা নেই; বরং একটি সুসংগঠিত বয়ান তৈরি করার চেষ্টা স্পষ্ট, যেখানে তথ্যকে বেছে বেছে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উপস্থাপনার মাধ্যমে জনমত প্রভাবিত করার প্রয়াস লক্ষ্য করা যায়।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের পরিস্থিতি ছিল গভীরভাবে অস্থির। প্রশাসনিক কাঠামোতে অনিশ্চয়তা, অর্থনীতিতে চাপ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা—সব মিলিয়ে একটি জটিল বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্ব ছিল অত্যন্ত কঠিন এবং বহুমাত্রিক। অর্থনৈতিক ধ্বস ঠেকানো, ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, গুম ও খুনের মতো অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা, বড় ধরনের দুর্নীতি ও অর্থপাচারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সর্বোপরি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা—এসবই ছিল সেই সময়ের জরুরি কাজ। এই পদক্ষেপগুলো নিয়ে সমালোচনা থাকতে পারে, মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু সেই সমালোচনা যখন তথ্যভিত্তিক না হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণে পরিণত হয়, তখন সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা।
এই প্রেক্ষাপটে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন কালের কণ্ঠ এবং বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরডটকমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেখানে একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। পুরো প্রেক্ষাপট তুলে না ধরে আংশিক তথ্য উপস্থাপন, শিরোনামে অতিরঞ্জন, এবং ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার মতো ভাষার ব্যবহার—এসবই একটি পরিকল্পিত কৌশলের অংশ বলে মনে হয়। এই ধরনের উপস্থাপনা পাঠকের কাছে একটি বিকৃত বাস্তবতা তৈরি করে, যেখানে সত্য ও অর্ধসত্যের মিশ্রণ দিয়ে একটি কাঙ্ক্ষিত ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
গণমাধ্যমের ওপর কর্পোরেট মালিকানার প্রভাব নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশ্বজুড়ে “মিডিয়া ক্যাপচার” নামে একটি বহুল আলোচিত ধারণা রয়েছে, যেখানে শক্তিশালী অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে। বাংলাদেশেও এই প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। যখন কোনো প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় তদন্ত বা আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়, তখন সেই গোষ্ঠীর মিডিয়া ইউনিট সক্রিয় হয়ে ওঠে—এটি একটি বহুল পরিচিত প্যাটার্ন। সংবাদ তখন আর কেবল তথ্য পরিবেশনের মাধ্যম থাকে না; এটি হয়ে ওঠে একটি কৌশলগত হাতিয়ার।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতেও সেই একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার আলোচনা সামনে আসে, তখন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোতে হঠাৎ করেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক নেতিবাচক প্রতিবেদন প্রকাশ শুরু হয়। এটি নিছক কাকতালীয় বলে মনে করা কঠিন। বরং এটি একটি “কাউন্টার ন্যারেটিভ” তৈরির প্রচেষ্টা—যেখানে মূল ইস্যু থেকে দৃষ্টি সরিয়ে একটি বিকল্প বিতর্ক তৈরি করা হয়।
এই ধরনের প্রতিবেদনে কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। প্রথমত, অর্ধসত্যের ব্যবহার। সম্পূর্ণ তথ্য না দিয়ে এমন কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়, যা পাঠকের মধ্যে সন্দেহ বা বিভ্রান্তি তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী ভাষা ও শিরোনাম, যা পাঠকের আবেগকে নাড়া দেয় কিন্তু বাস্তবতার পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। তৃতীয়ত, ব্যক্তিকেন্দ্রিক আক্রমণ, যেখানে নীতিগত সমালোচনার বদলে ব্যক্তি চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। চতুর্থত, একই ধরনের বয়ান বারবার পুনরাবৃত্তি করা, যাতে সেটি ধীরে ধীরে “সত্য” হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—সম্পাদকীয় স্বাধীনতা আসলে কতটা কার্যকর? একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক যদি একটি বৃহৎ কর্পোরেট গোষ্ঠী হয়, তাহলে সেই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত কতটা নিরপেক্ষ হতে পারে? বাস্তবতা হলো, মালিকানার প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো খুবই কঠিন। অনেক ক্ষেত্রেই সম্পাদকীয় নীতি মালিকের ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত হয়। এর সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ঝোঁক বা সংশ্লিষ্টতা যুক্ত হয়, তাহলে সংবাদ পরিবেশন আরও বেশি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে ওঠার ঝুঁকি থাকে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়। যেসব দেশে গণমাধ্যমের ওপর কর্পোরেট বা রাজনৈতিক প্রভাব বেশি, সেখানে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে কম। রাশিয়া, তুরস্ক বা ভারতের কিছু উদাহরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মিডিয়াগুলো প্রায়ই নির্দিষ্ট বয়ান প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশেও সেই একই প্রবণতা ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি সতর্কবার্তা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জনগণের। কারণ শেষ পর্যন্ত সংবাদ গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা পাঠকের হাতেই থাকে। ডিজিটাল যুগে মানুষ এখন একাধিক উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে একই সঙ্গে ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং প্রপাগান্ডার ঝুঁকিও বেড়েছে। তাই এখন প্রয়োজন তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা, একাধিক উৎস থেকে খবর নেওয়া এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা করা।
প্রকৃত সাংবাদিকতা কখনোই সহজ পথ অনুসরণ করে না। এটি সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর একটি কঠিন দায়িত্ব, যেখানে ক্ষমতার সমালোচনা থাকবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান থাকবে এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কিন্তু যখন এই মূলনীতি থেকে বিচ্যুতি ঘটে, তখন সাংবাদিকতা আর তার মূল চরিত্র ধরে রাখতে পারে না। তখন সেটি হয়ে ওঠে একটি “ইনফরমেশন ব্যবসা”, যেখানে তথ্য নয়, বরং প্রভাবই মুখ্য হয়ে ওঠে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে রয়েছে জনস্বার্থ, সত্য এবং নৈতিকতা; অন্যদিকে রয়েছে কর্পোরেট স্বার্থ, প্রভাব এবং প্রপাগান্ডা। এই দুইয়ের মধ্যে কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা কেমন হবে।
মুহাম্মদ ইউনূস-কে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো হয়তো একটি নির্দিষ্ট উদাহরণ, কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে বৃহত্তর বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে, সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আজ যারা সংবাদ পরিবেশনের নামে বয়ান তৈরি করছে, তারা হয়তো সাময়িকভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ফল ভোগ করতে হবে পুরো গণমাধ্যমকেই।
ইতিহাস সবকিছু মনে রাখে। কে সত্যের পক্ষে ছিল, আর কে প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করেছে—তা একসময় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই এখনই সময় গণমাধ্যমের আত্মসমালোচনার। নিজেদের ভূমিকা পুনর্বিবেচনা করার। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা পুনরুদ্ধার করার।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
কারণ শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার একটাই পরিচয়—এটি সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে এবং ন্যায়ের পক্ষে। আর এই অবস্থান থেকে বিচ্যুতি ঘটলে, সেটি আর সাংবাদিকতা থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে কেবলমাত্র স্বার্থের হাতিয়ার।
লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


