পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্রকে আমরা প্রায়ই স্থায়ী বলে ধরে নিই। কিন্তু ইতিহাস বলছে, কোনো রাষ্ট্রই চিরস্থায়ী নয়। একসময় রোমান সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাম্রাজ্য, পরবর্তীতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুগোস্লাভিয়ার মতো বৃহৎ রাষ্ট্রও সময়ের প্রবাহে ভেঙে গেছে।

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন, জাতিগত বিভাজন, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নতুন করে বহু দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, আগামী কয়েক দশকে কিছু দেশ পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, আবার কিছু দেশ তাদের বর্তমান সীমানা হারিয়ে নতুন রাজনৈতিক রূপ নিতে পারে।
মালদ্বীপ
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি মালদ্বীপ। সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান হওয়ায় এর বহু দ্বীপ ইতোমধ্যেই পানির উচ্চতা বৃদ্ধির হুমকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিদেশে জমি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে নাগরিকদের স্থানান্তর করা যায়। কোনো দেশ যদি পুরোপুরি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক আইনে তার রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—মালদ্বীপ সেই প্রশ্নের একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।
বেলজিয়াম
ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র বেলজিয়ামে দীর্ঘদিন ধরেই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বিভাজন বিদ্যমান। ডাচভাষী ফ্ল্যান্ডার্স এবং ফরাসিভাষী ওয়ালোনিয়া অঞ্চল রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে আলাদা প্রবণতা বহন করে। রাজধানী ব্রাসেলস এই দুই অঞ্চলের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেও বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে।
কিরিবাতি
প্রশান্ত মহাসাগরের ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে নিচু প্রবাল দ্বীপগুলো ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে এবং সুপেয় পানির উৎস লবণাক্ত হয়ে পড়ছে। সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় সরকার ফিজিতে জমি কিনে রেখেছে, যাতে প্রয়োজন হলে নাগরিকদের পুনর্বাসন করা যায়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
১৯৯৫ সালের ডেটন চুক্তির মাধ্যমে বসনিয়ায় একটি জটিল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে ওঠে। দেশটিতে তিনটি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সার্ব অধ্যুষিত রিপাবলিকা স্র্পস্কা অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা এবং ক্রোয়াট জনগোষ্ঠীর স্বায়ত্তশাসনের দাবি দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
উত্তর কোরিয়া
দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও টিকে আছে উত্তর কোরিয়া। তবে খাদ্য সংকট, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং তথ্যপ্রবাহের বিস্তার দেশটির শাসনব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কিম শাসনব্যবস্থা পরিবর্তিত হলে বা দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ ঘটলে দেশটির বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলে যেতে পারে।
ইয়েমেন
বহু বছরের গৃহযুদ্ধে ইয়েমেন কার্যত বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান। একসময় পৃথক উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন হিসেবে পরিচিত এই দেশ আবারও বিভক্ত কাঠামোয় ফিরে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
টুভালু
প্রশান্ত মহাসাগরের আরেক দ্বীপরাষ্ট্র টুভালু সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে, পানির সংকট বাড়ছে এবং জোয়ারের পানি গ্রামে ঢুকে পড়ছে। ফলে অনেক নাগরিক ইতোমধ্যেই দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হচ্ছেন।
লিবিয়া
২০১১ সালে মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত। বর্তমানে দেশটিতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রশাসন সক্রিয় রয়েছে। বিপুল তেলসম্পদ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা না হওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি বিভাজনের ঝুঁকি বাড়ছে।
যুক্তরাজ্য
ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রবণতা আবারও জোরদার হয়েছে। স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার দাবি এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেশটির ভবিষ্যৎ কাঠামোকে প্রভাবিত করতে পারে।
সোমালিয়া
দীর্ঘ সময় ধরে সোমালিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। রাজধানীর বাইরে অনেক অঞ্চলে স্থানীয় গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে। সোমালিল্যান্ড কার্যত স্বাধীনভাবে পরিচালিত হলেও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি, যা ভবিষ্যৎ বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।
স্পেন
স্পেনে কাতালোনিয়া ও বাস্ক অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদ দীর্ঘদিনের বিষয়। কাতালোনিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় স্বাধীনতার দাবিকে এখনও জীবিত রেখেছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ।
ইরাক
জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজনের কারণে ইরাকের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন ধরেই নাজুক। কুর্দিস্তান অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ভবিষ্যতে নতুন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করছে।
হাইতি
রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং সশস্ত্র গ্যাং সহিংসতায় হাইতির রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। রাজধানীর বড় অংশ অপরাধী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে।
সাইপ্রাস
১৯৭৪ সাল থেকে সাইপ্রাস কার্যত বিভক্ত। দক্ষিণ অংশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলেও উত্তর অংশ কেবল তুরস্কের স্বীকৃতি পেয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পরও পুনরেকত্রীকরণ সম্ভব হয়নি।
মলদোভা
পূর্ব ইউরোপের ছোট দেশ মলদোভা দীর্ঘদিন ধরেই ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে। ট্রান্সনিস্ট্রিয়া অঞ্চল বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব দেশটির ভবিষ্যৎকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র কখনোই স্থির নয়। জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট, জাতিগত দ্বন্দ্ব এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আগামী দিনে বহু দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কিছু দেশ বর্তমান রূপে টিকে থাকবে, কিছু পরিবর্তিত হবে, আবার কিছু হয়তো ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



