এক সময় আমাদের সমাজে এক চমৎকার মানবিক চর্চা ছিল—বাড়িতে ভালো কিছু রান্না হলে তার একটি অংশ প্রতিবেশীর জন্য পাঠানো হতো। এর মাধ্যমে শুধু খাবার ভাগাভাগিই নয়, মানুষের মধ্যে আন্তরিকতা ও ভালোবাসার বন্ধনও দৃঢ় হতো। একই সঙ্গে এটি ছিল মহানবী (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। হাদিসে বর্ণিত আছে, আবু জার (রা.) থেকে, রাসুল (সা.) বলেছেন—“তুমি যখন তরকারি রান্না করবে, তখন তাতে ঝোল বেশি করো এবং প্রতিবেশীকে কিছু দাও।” (মুসলিম)

ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, সাহাবায়ে কেরাম মনে করতে শুরু করেছিলেন—হয়তো প্রতিবেশীকেও উত্তরাধিকারী করা হবে। ইবনে উমার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন—“জিবরীল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে এত বেশি উপদেশ দিতে থাকেন যে, আমি ধারণা করেছিলাম তিনি তাকে ওয়ারিস করে দেবেন।” (বুখারি)
বাংলাদেশেও একসময় এই সুন্দর সুন্নতের ব্যাপক প্রচলন ছিল। কিন্তু বর্তমান ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক জীবনে এই অভ্যাস অনেকটাই হারিয়ে গেছে। এখন অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া তো দূরের কথা, ঘরে অতিথি এলে আন্তরিক আপ্যায়নের পরিবর্তে দায়সারা আচরণ করা হয়—যা আমাদের নৈতিকতা ও ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী।
ইসলাম মানুষকে দয়া, উদারতা ও মেহমানদারির শিক্ষা দেয়। সুখ-দুঃখ, স্বচ্ছলতা বা অভাব—সব অবস্থাতেই নিঃস্বার্থভাবে মানুষকে খাওয়ানো জান্নাতিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, “তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মিসকিন, এতিম ও বন্দীকে খাদ্য দান করে।” (সুরা আদ-দাহর: ৮)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, নিঃস্বার্থভাবে খাদ্য দান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয় কাজ। এখানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—খাদ্য দান করতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য, কোনো প্রতিদানের আশা ছাড়া, প্রশংসার লোভ ছাড়াই এবং আল্লাহভীতির সঙ্গে।
বর্তমান সময়ে আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য থাকলেও, কেউ যদি সামর্থ্য অনুযায়ী অন্যকে খাওয়ানোর চেষ্টা করে, তবে সে অবশ্যই সৌভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “দুর্ভিক্ষের দিনে খাদ্য দান করা, এতিম আত্মীয় বা অসহায় মানুষকে সাহায্য করা—এবং ঈমান ও ধৈর্যের উপদেশ দেওয়া—এগুলোই সৌভাগ্যবানদের গুণ।” (সুরা বালাদ: ১৪-১৮)
আজকাল অনেকেই মেহমানদারিতে অনাগ্রহী। অথচ অতিথিকে সম্মান করা ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, সে যেন প্রতিবেশীর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে এবং মেহমানকে সম্মান করে।” (মুসলিম)
মেহমানদারি করলে রিজিক কমে না; বরং ঘরে বরকত আসে এবং গুনাহ মাফ হয়। হাদিসে উল্লেখ আছে, মেহমান তার রিজিক নিয়ে আসে এবং গৃহস্থের গুনাহ নিয়ে চলে যায়।
সারসংক্ষেপে বলা যায়, প্রতিবেশী ও অতিথির প্রতি সদাচরণ, সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষকে খাওয়ানো—এসবই ঈমানের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম। এগুলো দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার পথও বটে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহান গুণাবলি অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


