জুমবাংলা ডেস্ক : ময়দার সঙ্গে মেশানো হয় চালের আটা। সেটা গোলানো হয় পানিতে, সঙ্গে মাখানো হয় ডালডা। এরপর ছোট ছোট টুকরো করে ছাড়া হয় ফুটন্ত তেলে। ভাজা হলেই মাখা হয় গুড়ের সিরায়। ঠাণ্ডা হয়ে আসলেই খাওয়ার জন্য প্রস্তুত মুচমুচে সুস্বাদু কটকটি।

কটকটির চাহিদা

Advertisement

এ কথা বলছিলেন মহাস্থান গড়ের কটকটি ব্যবসায়ী মাহবুরের স্ত্রী সালমা বেগম। স্বামী-স্ত্রী মিলে কটকটি তৈরি করে মাজারের পশ্চিমের মাঠে বিক্রি করেন। বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান এলাকার শতবর্ষ ধরে পরিচিত খাবার এই কটকটি। এর উৎপত্তির ইতিহাস না জানা গেলেও সবার কাছে অতি প্রিয় একটি খাবার।

আজও মহাস্থানের মাজার ও প্রাচীন নির্দশন এলাকায় বেড়াতে আসা দর্শনার্থীরা ফেরার সময় কটকটি কিনতে ভোলেন না। শুধু তাই নয়, কোথাও বেড়াতে গেলে কটকটি নিয়ে যাওয়া স্থানীয়দের কাছে অনেকটা রেওয়াজের মতো। সালমা জানান, ছোট থেকেই কটকটি তৈরির কাজ জানতেন। তবে বিয়ের পর থেকে এ পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন।

স্বামী মাহবুর রহমান প্রায় সাত বছর কারিগর হিসেবে অন্যের কারখানায় কাজ করেছেন। এখন সাত বছর ধরে নিজে ব্যবসা করছেন। বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মহাস্থান গড়ের উপরে।

মাহবুর বলেন, আগে কটকটি গরম পানি দিয়ে মাখিয়ে তৈরি হতো। সেই কটকটি ঠাণ্ডা হয়ে আসলে খুব শক্ত হতো। খাওয়ার সময় কটকট করে শব্দ হতো। এখন নরম করে তৈরি করা হয়। তবে চাহিদা আগের চেয়ে আরও বেশি হয়েছে।

তিনি জানান, আরও আগে গমের আটা দিয়ে তৈরি হতো। পরে চালের গুড়ো দিয়ে তৈরি শুরু হয়। কত আগে এই কটকটি খাবার আবিষ্কার হয়েছে তিনি নিজেও জানেন না।

দেশব্যাপী এর চাহিদা থাকায় মহাস্থান এলাকায় কটকটির বেশ বড় একটি বাজার গড়ে উঠেছে। আর এর সঙ্গে অন্তত ৫০০ জন ব্যবসায়ী ও কারিগর জড়িত রয়েছে। এ বাজারে মাসে বা বছরে কী পরিমাণ কটকটি বিক্রি হয় তার কোনো পরিসংখ্যান নেই ব্যবসায়ীদের কাছে।

ব্যবসায়ীদের তথ্যের গড় হিসাবে দেখা গেছে, বছরে ছয়মাস (নভেম্বর থেকে এপ্রিল) মহাস্থানগড়ে পর্যটন মৌসুম ধরা হয়। এই সময়ে গড়ে অন্তত প্রতিদিন ২৫০ মণ কটকটি বিক্রি হয়। অন্য সময়গুলো দৈনিক ১০০ কেজি পরিমাণ বিক্রি হয়ে থাকে। এই হিসেবে মাসে ৬ হাজার মণ, বছরে ৭২ হাজার মণ কটকটি কেনাবেচা হয়। তবে সম্প্রতি দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির প্রভাব পড়েছে কটকটি ব্যবসায়ের ওপর। দাম বাড়ার কারণে ব্যবসায়ীদের লাভের অংকে টান পড়েছে।

ব্যবসার অবস্থা নিয়ে মাহবুর বলেন, ‘সবকিছুর দাম বাড়ার কারণে লাভ অনেক কমে গেছে। যে গুড়ের দাম ছিল ৪৫ টাকা; তা হয়েছে ৮৩ টাকা কেজি। ডালডা ১৬ কেজির একটি কার্টন কিনতে লাগে ২৮০০ টাকা। অথচ করোনার আগেই এর দাম ছিল ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা। তেল কিনে এনেছি ১৭০ টাকায়। কেনার পর তো আরও দাম বেড়েছে।’

তিনি জানান, এক কেজি কটকটি তৈরি করতে খরচ হয় গড়ে প্রায় ১১০ টাকা। এ হিসাবে প্রতি কেজিতে গড়ে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত লাভ করা যেত। এখন তা অর্ধেকে নেমে গেছে।

তবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলেও কটকটির চাহিদা কমেনি। মানুষের কাছে এর চাহিদা সমানই থাকে। প্রতি কেজি কটকটি মানভেদে ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। সয়াবিন তেলে ভাজা কটকটি ১২০ টাকা কেজিতে, ডালডায় ১৪০ এবং ঘি মাখা ১৬০ টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে।

ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা জানান, এই কটকটি মাজারের তবারক হিসেবে গন্য করা হয়। এ ছাড়াও মেহমানদের আপ্যায়ণে মুখরোচক কটকটি ব্যবহার করে স্থানীয়রা। মহাস্থান গড় উত্তর পাড়ার বাসিন্দা কবিরাজ বাদশা পীর জানান, এই মহাস্থান শাহ মো. সুলতান বলখীর মাজারে অনেক মানুষ প্রতিদিন আসেন। জিয়ারত করেন, মানত করেন। আগতরা এখানে এলে কটকটি ক্রয় করেন। এটা মাজারের তবারক হিসেবেই সবাই দেখে। সব সময় এর বেচাবিক্রি ভালো। তবে রমজান মাসে বিক্রি কম থাকে।

গড়ের ওপর জাকারিয়া কটকটির মালিক নুরনবী ইসলাম জানান, দোকানে প্রতিদিন গড়ে ১০০ কেজি কটকটি বিক্রি হয়। শুক্রবার করে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত কটকটি বিক্রি হয়ে থাকে।

নুরনবীর সঙ্গে কথা বলার সময় নওগার ধামইরহাট থেকে আসা একদল দর্শনার্থী আসেন কটকটি কেনার জন্য। তারা ১৫ কেজি কটকটি কিনেন নুরনবীর কাছে থেকে।

তাদের একজন আইয়ুব আলী জানান, তারা দুই বাসে প্রায় ১০০ জন মহাস্থানে বেড়াতে এসেছেন। এসেই নিচে ও ওপরের দোকান ঘুরে প্রায় ৪০ কেজি কটকটি ক্রয় করেছেন। এসব কটকটি বাড়ির ও আত্মীয় স্বজনদের জন্য নিয়েছেন।

এই দলের আরেক জন শামীম হোসেন জানান, তাদের গ্রামে মহাস্থানের কটকটি খুব জনপ্রিয়। মহাস্থান গড়ের নিচের এক দোকানে কথা হয় আরেক দর্শনার্থীর মো. মাজহারুল ইসলাম । তার বাড়ি যশোরে। বগুড়ায় থাকেন চাকরির সুবাদে। সুযোগ পেয়ে মহাস্থান বেড়াতে এসেছেন।

কটকটি খেয়েছেন কিনা প্রশ্নে মাজহারুল বলেন,‘ ঐতিহাসিক এই এলাকায় এসে এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার কটকটি খাবো না? খেয়েছি আবার নিয়েও যাচ্ছি।’ মহাস্থান গড়ের নিচে বগুড়া-শিবগঞ্জ সড়কের মাজার রোডের দুপাশে একাধিক দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকান অনেক পুরোনো। বেশিরভাগই প্রায় ৫০ থেকে ৬০ বছর ধরে ব্যবসা করছে।

আলাদা এসব দোকানে বড় বড় গামলা ও ড্রামের ট্রেতে কটকটির বিশাল পসরা সাজিয়ে বসেছেন তারা। বড় দোকানগুলোর মধ্যে রয়েছে লাল মিয়া কটকটি ঘর, নাসির কটকটি প্যালেস, হামু মামা কটকটি প্যালেস, সুলতান কটকটি প্যালেস, চায়না কটকটি ঘর, আলাউদ্দিন কটকটি ভান্ডার, জিন্নাহ কটকটি ভান্ডার, ফাতেমা কটকটি প্যালেস, আল আমীন কটকটি প্যালেস, লায়েব কটকটি ভান্ডার, শাহাদত কটকটি ভান্ডার ইত্যাদি।

নাসির কটকটি ভাণ্ডারের মালিকের ছেলে শহিদুল ইসলাম রঞ্জু এখন ব্যবসা দেখাশোনা করেন। তিনি জানান, কটকটির সুনাম সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে। এ জন্য ব্যবসাও প্রসার হচ্ছে। এখানকার প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানের কারখানাতো রয়েছেই। এ ছাড়াও অনেকে শুধু কারখানা গড়ে তুলেছেন। যেখানে নারী শ্রমিকরাই বেশি।

মহাস্থানের পুরোনো দোকানের মধ্যে অন্যতম হামু মামা কটকটি প্যালেস। দোকানের ব্যবসায়ী হুমায়ুন কবির জানান, মহাস্থান মাজারের উপর আর নিচের অংশ মিলে প্রায় ২০০টি দোকান কটকটির ব্যবসা করে। শুক্রবারে গড়ের উপর মাজারের পশ্চিম পাশে বেশি বিক্রি হয়। আর নিচের দোকানগুলো তো ব্যবসা করেই।

তিনি বলেন, কটকটি মূলত মাজারের একটা তবারক হিসেবে প্রচলিত হয়েছে। প্রায় দেড়শ বছর ধরে কটকটির ব্যবসা হয়ে আসছে। ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই ব্যবসার মূল সিজন (মৌসুম) ধরা হয়। এ সময় প্রচুর বিক্রি হয়। বিভিন্ন পিকনিক পার্টি থেকে শুরু করে ওরশের লোকজন এ সময় বেশি আসে। বৈশাখের শেষ বৃহস্পতিবার এখানে সবচেয়ে বেশি কটকটি বিক্রি হয়ে থাকে।

স্বাদে অতুলনীয় ব্ল্যাক টমেটোর গাছপ্রতি ফলন ৭ কেজি

হুমায়ুন আরও বলেন, এ এলাকায় শুধু কটকটি ব্যবসার সঙ্গে অন্তত ৫০০ জন মানুষ নিয়োজিত রয়েছে। এর কারিগরদের চাহিদা যেমন বেশি পারিশ্রমিকও অনেক বেশি।

বগুড়া জেলা চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি মাহফুজুল ইসলাম রাজ বলেন, বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী খাবার কটকটি। এর সুনাম শুধু দেশ নয়; বিশ্বেও ছড়িয়েছে। কটকটি ব্যবসার সঙ্গে বহু নারীপুরুষ জড়িত রয়েছে আমরা জানি। যা আমাদের জেলা বগুড়ার জন্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.