‘এবছর মৌসুমের শুরুতেই দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৩৫-৩৯ ডিগ্রি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ভোরে কুয়াশাও ছিল। এতে করে মুকুল পুড়ে যায়। তাই লিচুর ফলন কম হয়েছে। এখন আবার শুরু হয়েছে ঝড়-শিলাবৃষ্টি। সব মিলিয়ে লিচুর অবস্থা খারাপ।’

লিচুর ফলন

Advertisement

এভাবেই হতাশার কথা জানাচ্ছিলেন দিনাজপুর সদর উপজেলার মহব্বপুর গ্রামের লিচু চাষি অ্যাডভোকেট জাকির হোসেন। তার মতো জেলার বেশিরভাগ কৃষকের চোখে-মুখে এখন হতাশা। কারণ বৈরী আবহাওয়ার কারণে এবার লিচুর ফলন কম বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

জাকির হোসেনের ভাষ্য, ‘গত মৌসুমে তাপপ্রবাহে লিচু পুড়েছে। এবার ঝড়-বৃষ্টি ও জ্বালানি ভোগাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কী হবে বলা মুশকিল।’

মৌসুমের শুরুতে অনাবৃষ্টি, মাঝে জ্বালানি সংকট, সবশেষ কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টির বাগড়া—এই তিন কারণে এবার দিনাজপুরে লিচু উৎপাদন হ্রাসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে চলতি মৌসুমে জেলার সুমিষ্ট লিচু চাষ ঘিরে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, তা অনেকটা ফিকে রূপ ধারণ করেছে দুর্যোগের কারণে।

‘গতবছর গরমে লিচু গাছেই ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। এবার ঝড়-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। এবারও লিচুতে লোকসান গুনতে হবে’—চাষি

তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এখন পর্যন্ত লিচুর তেমন ক্ষতি হয়নি। তাই ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান প্রস্তুত করা হয়নি। যতটুকু ক্ষতি হয়েছে তা উল্লেখ করার মতো নয়।

আগামী ১৫ মের মধ্যে বাজারে লিছু উঠতে শুরু করবে। কিন্তু ঈদুল আজহার কারণে পরিবহন সংকট ও যানজট বিবেচনা মাথায় রেখে এবার লিচুর মূল বেচাকেনা হবে ঈদের পরেই।

গত কয়েক বছর শিলাবৃষ্টি ও করোনা মহামারির বড় প্রভাব পড়েছিল লিচুর ওপরে। লিচু ঝরে পড়ায় স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল বাগানি ও ব্যবসায়ীদের। গত মৌসুমে কয়েক বছরের ক্ষতি পুষিয়ে লাভের আশা করছিলেন বাগানি ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তীব্র তাপপ্রবাহে লিচুতে পোড়া দাগ ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। এ কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হন বাগানি ও ব্যবসায়ীরা। এবার এখনো তাপপ্রবাহ শুরু না হলেও প্রাকৃতিক অন্যান্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন তারা।

জেলার লিচু চাষিরা জানান, চলতি মৌসুমের শুরুতে মুকুলের সমারহ ও পরে গুটি দেখে তার আশায় বুক বেঁধেছিলেন। কিন্তু খরা ও তাপপ্রবাহে প্রথমে লিচুর মুকুল পুড়ে যেতে শুরু করে। পরে গুটি ঝড়তে শুরু করে। মাঝে বৃষ্টিতে লিচু ঝরে পড়া বন্ধ হয়ে যায়। গত মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে চলতি মাসে দিনাজপুরে ব্যাপক হারে ঝড় ও শিলাবৃষ্টি হয়। এতে করে লিচুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

তারা আরও জানান, মৌসুমের শুরুতে তেল সংকটের কারণে বাগানে পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারেনি বাগানিরা। এ কারণেও এবার ফলন ‍নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।

‘গতবার দাবদাহে লিচু জ্বলে-পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। ১০০ টাকায় ১০০ লিচু বিক্রি করতে হয়েছিল। এবার যদি ঝড়-বৃষ্টি চলতে থাকে, তাহলে লিচুর গোড়ায় পচন ধরবে’—ব্যবসায়ী

লিচুর জন্য বিখ্যাত সদর, বিরল, চিরিরবন্দর, খানসামা, কাহারোল ও বোঁচাগঞ্জ উপজেলায় খবর নিয়ে জানা গেছে, শিলাবৃষ্টির কারণে অনেক এলাকায় লিচু ঝরে পড়েছে। অনেক লিচু পচে যাচ্ছে। সে কারণে বাজারে আসার ১০-১৫ দিন আগে লিচুতে বিপর্যয় ও লোকসানের শঙ্কায় আছেন লিচু চাষি ও বাগান লিজ নেওয়া ব্যবসায়ীরা।

কথা হয় বিরল উপজেলার লিচু চাষি রতন রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, তার বাগানে লিচু পচে ঝরে পড়ছে। কোনোভাবেই লিচু গাছে রাখা যাচ্ছে না। তিনি এবার বড় ধরনের লোকসানে পড়বেন।

বিরল উপজেলার রবিপুর এলাকার লিচু ব্যবসায়ী মফিজুল ইসলাম বলেন, তিনি রবিপুর ও মাধববাটি এলাকায় বাগান কিনেছেন। বাগানে বোম্বাই লিচু রয়েছে। তবে শিলাবৃষ্টির কারণে লিচু ফেটে ঝরে যাচ্ছে।

মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক স্প্রে করে লিচু রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। জানি না শেষ পর্যন্ত কী হবে।’

সদর উপজেলার ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল ইসলাম। তিনি এবার তিন একর জমিতে লিচুর বাগান করেছেন। জানালেন, এবার ফলন কম। তার বাগানে গত বছরের চেয়ে লিচুর উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছে।

জুয়েল ইসলাম বলেন, দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার পরিবহন খরচ বেড়ে যাবে। এতে করে লিচুর দামও বাড়বে।

সংরক্ষণের জন্য হিমাগার না থাকায় সংরক্ষণের অভাবে হাজার হাজার টন লিছু নষ্ট হয়ে যায়। এ বিষয়ে সরকারের পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘এবার তাপমাত্র অনেক বেশি। চলমান তাপপ্রবাহে লিচুর কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে। চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এবার পর্যাপ্ত লিচু হয়েছে। খুব বেশি ক্ষতি হবে না। কারণ ব্যাপকভাবে লিচুর পরিচর্যা করছেন মালিক ও বাগানিরা’—কৃষি কর্মকর্তা

বিরল উপজেলার মাধববাটি গ্রামের মকলেছুর রহমান বলেন, ‘গতবছর গরমে লিচু গাছেই ফেটে নষ্ট হয়ে গেছে। এবার ঝড়-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। এবারও লিচুতে লোকসান গুনতে হবে।’

ঢাকার কারওয়ান বাজার থেকে মাধববাটিতে লিচুর বাগান কিনেছেন আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গতবার দাবদাহে লিচু জ্বলে-পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছিল। ১০০ টাকায় ১০০ লিচু বিক্রি করতে হয়েছিল। এবার যদি ঝড়-বৃষ্টি চলতে থাকে, তাহলে লিচুর গোড়ায় পচন ধরবে।’

তিনি বলেন, ‘আশা ছিল গতবারের লোকসান এবার পুষিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু সে আশায় গুড়েবালি। এখন পুঁজি টেকানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

লিচুর সঠিক উৎপাদনে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ- পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, দিনাজপুরের জেলার লিচুর একটি সুনাম রয়েছে। বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়। আশা করছি, এবারও আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পাবো।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নুরুজ্জামান বলেন, ‌‘এবার তাপমাত্র অনেক বেশি। চলমান তাপপ্রবাহে লিচুর কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে। চাষি, বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এবার পর্যাপ্ত লিচু হয়েছে। খুব বেশি ক্ষতি হবে না। কারণ ব্যাপকভাবে লিচুর পরিচর্যা করছেন মালিক ও বাগানিরা।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবছর জেলায় লিচু চাষ করা জমির পরিমাণ পাঁচ হাজার ৪৮৪ হেক্টর। জেলায় লিচু বাগান রয়েছে পাঁচ হাজার ৪১৮টি। লিচু উৎপাদনের আশা ৩৭ হাজার ৫৯৩ মেট্রিক টন।

আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে

অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. আনিসুজ্জামান বলেন, ‌‘ঝড়-শিলাবৃষ্টিতে লিচুর খুব একটা ক্ষতি হয়নি। কমবেশি এক থেকে দেড় হেক্টর জমির লিচু নষ্ট হয়েছে, যা উল্লেখ করার মতো নয়।’

সূত্র ও ছবি : জাগোনিউজ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Shamim Reza is an experienced journalist and sub-editor at Zoom Bangla News, with over 13 years of professional experience in the field of journalism. Known for his strong writing skills and editorial insight, he contributes to producing accurate, engaging, and well-structured news content. Born and brought up in Jashore, his background and experience shape his deep understanding of social and regional perspectives in news reporting.