খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতকে মোগল সাম্রাজ্যের শীর্ষ সময়কালে নির্মিত একটি বিরল অ্যাস্ট্রোল্যাব লন্ডনের সোথবিসে নিলামে ২.৭৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি হয়েছে। প্রায় ৪০০ বছর পুরোনো এই পিতলের বৈজ্ঞানিক যন্ত্রটি ইতিহাসবিদদের মতে, ভারতীয় উপমহাদেশে তৈরি সবচেয়ে বড় অ্যাস্ট্রোল্যাবগুলোর একটি।

নিলাম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৬১২ সালে লাহোরে দুই দক্ষ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও কারিগর ভাই কায়িম মুহাম্মদ ও মুহাম্মদ মুকিম এটি নির্মাণ করেন। তাঁদের এই কাজটি সম্পন্ন হয় তৎকালীন প্রশাসক আগা আফজালের অনুরোধে।
অ্যাস্ট্রোল্যাব প্রাচীন এক বহুমুখী জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্র, যা আধুনিক কম্পাসের পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত। এর মাধ্যমে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থান নির্ণয়, সময় গণনা এবং দিক নির্ধারণ করা হতো। ইতিহাসবিদ ফেদেরিকা গিগান্তে একে “ত্রিমাত্রিক মহাবিশ্বের দ্বিমাত্রিক প্রতিফলন” হিসেবে বর্ণনা করে আধুনিক স্মার্টফোনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাস্ট্রোল্যাবের ধারণা প্রাচীন গ্রিক জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সময় থেকে বিকশিত হলেও অষ্টম শতাব্দী থেকে মুসলিম বিশ্বে এর ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে। আল-ফারাজি, আল-বাত্তানি, আল-বিরুনি, জারকালি ও মারিয়াম ইজলানি বহু মুসলিম বিজ্ঞানী এই যন্ত্রের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মুসলিম সমাজে বিশেষ করে কিবলা নির্ধারণ এবং নামাজের সময় নিরূপণে অ্যাস্ট্রোল্যাবের ব্যবহার ছিল ব্যাপক।
নিলামে বিক্রি হওয়া এই যন্ত্রটির উচ্চতা প্রায় ১৮ ইঞ্চি এবং ওজন ৮.২ কেজি—যা সাধারণ অ্যাস্ট্রোল্যাবের তুলনায় প্রায় চার গুণ বড়। এতে ৩৮টি নক্ষত্র এবং মক্কা, কাশ্মীর, লাহোরসহ ৯৪টি শহরের অবস্থান খোদাই করা রয়েছে। সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি পরিমাপের দাগগুলো ডিগ্রির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত বিভাজিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সম্ভবত এখন পর্যন্ত টিকে থাকা সবচেয়ে বড় অ্যাস্ট্রোল্যাব, যা তৎকালীন লাহোরের উন্নত কারুশিল্প ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতার অনন্য নিদর্শন।
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, মোগল আমলে লাহোর ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মুঘল সম্রাট শাসনামলে মধ্য এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীরা সেখানে এসে বসবাস শুরু করেন।
পরবর্তীকালে এই অ্যাস্ট্রোল্যাবটি বিভিন্ন সংগ্রাহকের হাতে ঘুরে সওয়াই মান সিং-এর সংগ্রহে যায়। ১৯৭০ সালে তাঁর মৃত্যুর পর এটি রাজমাতা গায়েত্রী দেবীর কাছে হস্তান্তরিত হয় এবং পরে লন্ডনের একটি ব্যক্তিগত সংগ্রহে স্থান পায়।
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
উল্লেখযোগ্যভাবে, একই নির্মাতাদের আরেকটি ছোট অ্যাস্ট্রোল্যাব বর্তমানে ইরাকের জাতীয় মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে, যা এই ঐতিহাসিক যন্ত্র নির্মাণ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতার সাক্ষ্য বহন করে।
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


