অফিস বা ক্লাসের টানা চাপ শেষ। বহু অপেক্ষার পর অবশেষে ছুটি। ব্যাগ গুছানো, ঘোরার পরিকল্পনা সবই প্রস্তুত। ঠিক তখনই শরীর জানিয়ে দেয় বিপদের সংকেত। হঠাৎ ক্লান্তি, গলা ব্যথা, মাথা ধরার শুরু। আনন্দের ছুটি যেন অসুখের ছুটিতে বদলে যায়। আপনার সঙ্গেও কি এমন হয়? এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘লেজার সিকনেস’ বা অবসরকালীন অসুস্থতা। অর্থাৎ কাজের সময় খুব একটা অসুস্থ না হলেও, ছুটি বা সপ্তাহান্ত এলেই শরীর ভেঙে পড়ে।

২০০২ সালে নেদারল্যান্ডসের একদল গবেষক প্রথম ‘লেজার সিকনেস’ শব্দটি ব্যবহার করেন। প্রায় ১,৯০০ মানুষের ওপর করা জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৩ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন তারা কাজের দিনে খুব কম অসুস্থ হন, কিন্তু ছুটি বা অবসরে প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এই অসুস্থতার লক্ষণ হিসেবে উঠে আসে—
- মাথাব্যথা
- অতিরিক্ত ক্লান্তি
- সর্দি-জ্বর
- শরীর ব্যথা
- বমি বমি ভাব
গবেষণায় আরও দেখা যায়, সপ্তাহান্তের চেয়ে ছুটির সময় অসুস্থ হওয়ার প্রবণতা বেশি এবং সাধারণত ছুটির প্রথম সপ্তাহেই সমস্যা শুরু হয়। তবে গবেষকরা এটাও স্বীকার করেন, এই গবেষণাগুলো পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে উত্তর দিয়েছেন, যা সব সময় সঠিক নাও হতে পারে।
স্ট্রেস কমলেই কেন অসুখ বাড়ে
২০১৪ সালের আরেকটি গবেষণায় দেখা যায়, যেসব মানুষ নিয়মিত মাইগ্রেনে ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে হঠাৎ স্ট্রেস কমে গেলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাথাব্যথা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও সত্যি, অতিরিক্ত ব্যস্ততা ও চাপের মধ্যে থাকলে শরীর অনেক সময় অসুখের বিরুদ্ধে সাময়িকভাবে শক্ত থাকে। কিন্তু চাপ কমলেই সেই প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে।
কারণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, লেজার সিকনেসের পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ আছে—
- ভ্রমণের প্রভাব:
ছুটিতে ভ্রমণের সময় বিমানের মতো বন্ধ ও ভিড়যুক্ত জায়গায় থাকতে হয়, যেখানে জীবাণুর সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেশি।
- জীবনযাপনের পরিবর্তন:
ছুটিতে অনেকেই বেশি মদ্যপান করেন, অনিয়মিত ঘুমান বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করেন যা শরীরের ওপর চাপ ফেলে।
- লক্ষণ বোঝার সময় পাওয়া:
কাজের সময় আমরা এতটাই ব্যস্ত থাকি যে, শরীরের ছোটখাটো সমস্যা নজরে আসে না। ছুটিতে সময় পেলে মাথাব্যথা বা শরীর ব্যথা বেশি টের পাই।
দুশ্চিন্তা আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার সম্পর্ক বেশ জটিল। দুশ্চিন্তা সময় শরীরে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিন নামের হরমোন নিঃসৃত হয়। স্বল্প সময়ের জন্য এই হরমোনগুলো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পারে এবং ব্যথাও কম অনুভূত হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন স্ট্রেসে থাকলে কর্টিসলের মাত্রা বেশি হয়ে যায়, যা ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। ফলে যখন হঠাৎ চাপ কমে যায়, যেমন ছুটির শুরুতে শরীর আর সেই সাময়িক সুরক্ষা পায় না। তখনই অসুস্থতা দেখা দেয়।
ছুটি নিলেই অসুস্থ হওয়া এড়াবেন যেভাবে
যদিও লেজার সিকনেস নিয়ে এখনও অনেক কিছু অজানা, তবে কিছু অভ্যাস এই ঝুঁকি কমাতে পারে—
- নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম
- পর্যাপ্ত ঘুম
- পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য
- কাজের মাঝেও নিজের যত্ন নেয়া
ফিনল্যান্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ব্যায়াম শুরু করেছেন, তারা তুলনামূলকভাবে কম অসুস্থ হয়েছেন।
এ ছাড়া ধ্যান, মেডিটেশন ও মাইন্ডফুলনেস চর্চা মানসিক চাপ কমাতে কার্যকর। ভ্রমণের সময় ফ্লু বা কোভিডের টিকা হালনাগাদ রাখা, বিমানবন্দরে বা প্লেনে মাস্ক পরাও সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
ছুটি মানেই শরীর খারাপ এটা নিয়তি নয়। তবে দীর্ঘদিনের চাপ আর হঠাৎ বিশ্রামের মাঝে শরীর যে একটি মানিয়ে নেয়ার সময় চায়, সেটাই আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই ‘লেজার সিকনেস’। ছুটি উপভোগ করতে চাইলে, ব্যস্ত সময়েও নিজের যত্ন নিতে ভুলবেন না।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।


