আজ ৫ জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এমন দিনে পরিবেশের নীরব রক্ষক কাকের ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

কাক

Advertisement

একসময় শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই কাক ছিল অত্যন্ত পরিচিত এক পাখি। সকালবেলা ঘুম ভাঙত কাকের ডাকেই। দিনের বিভিন্ন সময়ে বাজার কিংবা আবর্জনার স্তূপের আশপাশে দলবেঁধে কাককে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। কিন্তু গত এক দশকে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। নগরজীবনের ব্যস্ততায় বিষয়টি চোখে না পড়লেও পরিবেশবিদদের মতে, কাকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়া পরিবেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত।

বাংলা সাহিত্যেও কাকের উপস্থিতি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কবি সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’-এ কাকের রূপ পাওয়া যায় এভাবে—

‘দাঁড়কাক কালো ধোঁয়া, পাতিকাক ছাই রে,
এর চেয়ে কালো কোনো কুচকুচে নাই রে।
কা কা কা কা ডাক ছাড়ে মন খুলে ভাই রে,
এত মিঠে গান আর ত্রিভুবনে নাই রে!’

রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসও ভোরের কাক হয়ে বাংলায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিলেন। অথচ আজ এই চিরচেনা পাখিটি অনেকটা বিরল হয়ে পড়েছে। শহর কিংবা গ্রাম—সবখানেই আগের মতো আর কাকের দেখা মেলে না।

কালো রঙের ও কর্কশ স্বরের এই পাখিটি প্রকৃতিতে ‘ঝাড়ুদার পাখি’ হিসেবে পরিচিত। আগে ডাস্টবিন বা আবর্জনার স্তূপে এদের দলবেঁধে খাবার খেতে দেখা যেত, ফলে পরিবেশ স্বাভাবিকভাবেই পরিষ্কার থাকত।

পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রে কাকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃত প্রাণী, পচা খাবার ও জৈব বর্জ্য খেয়ে তারা পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে সহায়তা করে। এ কারণেই কাককে বলা হয় ‘প্রকৃতির ঝাড়ুদার’। তাদের উপস্থিতি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ করার পাশাপাশি রোগজীবাণুর বিস্তারও কমায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। দ্রুত নগরায়ণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার এবং পরিবেশ দূষণ এর অন্যতম কারণ। পাশাপাশি মোবাইল টাওয়ারের রেডিয়েশন ও শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যও পাখিদের স্বাভাবিক জীবনচক্রে প্রভাব ফেলছে বলে ধারণা করা হয়।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ. এস. এম. সাইফুল্লাহ বলেন, একসময় শহর ও গ্রামাঞ্চলে প্রচুর দাঁড়কাক দেখা যেত, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

তার মতে, কৃষিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক কাকের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। মানুষের খাদ্যের উচ্ছিষ্টের মাধ্যমে সেই বিষ শরীরে প্রবেশ করে তাদের প্রজননক্ষমতা নষ্ট করছে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণও হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নগরায়ণের ফলে সবুজ এলাকা কমে যাচ্ছে, যার কারণে কাকের বাসা বাঁধা ও বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া এবং খাদ্যে বিষক্রিয়া—এই দুই কারণে কাকের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।

পরিবেশবিদদের মতে, কাক শুধু একটি পাখি নয়; এটি একটি সুস্থ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিছু বছর আগেও রাজধানী ঢাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কাকের ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। তারা প্রাকৃতিকভাবে বর্জ্য অপসারণে সহায়তা করত, যা নগর ব্যবস্থাপনার চাপ কমাত।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে তাই শুধু বৃক্ষরোপণ বা সচেতনতা নয়, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কাকসহ অন্যান্য পাখির জন্য নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি, সবুজায়ন বৃদ্ধি, কৃষিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাককে রক্ষা করা মানে পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষা করা। কারণ এই নীরব রক্ষক হারিয়ে গেলে তার প্রভাব পড়বে পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর—শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে মানুষই।

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.