সাইফুল ইসলাম : মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার হার্ডওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি (বিডি) লিমিটেডে শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের দাবিতে শ্রমিকরা কারখানার প্রধান ফটক বন্ধ করে আন্দোলন করেছেন। আন্দোলনের একপর্যায়ে শ্রমিক ও কারখানা কর্তৃপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

শনিবার (২০ জুন) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলা এ আন্দোলনে কারখানার শতাধিক শ্রমিক অংশ নেন।
শ্রমিকদের অভিযোগ, চীনা মালিকানাধীন হার্ডওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি (বিডি) লিমিটেডে দীর্ঘদিন ধরে সরকার ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে অন্তত তিনবার আন্দোলন হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। বিভিন্ন সময়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আন্দোলনের সময় চারজন শ্রমিককে মারধর করা হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে শ্রমিকরা সংঘবদ্ধ হয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের ওপর পাল্টা হামলা চালায়। এ সময় প্রশাসন ও সংবাদকর্মীদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
চলতি বছরের ৭ এপ্রিল প্রকাশিত সরকারি গেজেট অনুযায়ী ‘আয়রন ফাউন্ড্রি অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ শিল্প খাতের শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা হয়। গেজেট অনুযায়ী বিভাগীয় শহরের বাইরে কর্মরত গ্রেড-১ (সুপারভাইজার ও হেড মিস্ত্রি) শ্রমিকদের মোট মাসিক মজুরি ২৯ হাজার ১৬২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৮ হাজার ৮৩০ টাকা মূল মজুরি, ৭ হাজার ৫৩২ টাকা বাড়ি ভাড়া, ১ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা, ৮০০ টাকা যাতায়াত ভাতা এবং ১ হাজার টাকা ঝুঁকি ভাতা।
একইভাবে গ্রেড-২-এর মোল্ডার, কার্পেন্টার, ফিটার, ফার্নেসম্যান, মেশিনম্যান ও ডাইসম্যানসহ অন্যান্য শ্রমিকদের মোট মজুরি ২১ হাজার ৬৩০ টাকা এবং গ্রেড-৩-এর হেলপারদের মোট মজুরি ১৬ হাজার ৩৫২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে শ্রমিকদের দাবি, সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে কারখানায় নতুন শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ মোট ৭ হাজার ৭০০ টাকা এবং স্থায়ী শ্রমিকদের ১০ হাজার ৩০০ টাকা প্রদান করা হচ্ছে, যা সরকারি নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির তুলনায় অনেক কম।
কারখানার শ্রমিক মো. রবিউল ইসলাম, মো. হাসান, রায়হান, আরিফুল ইসলাম, হৃদয় ও মদনসহ একাধিক শ্রমিক জানান, সরকারি গেজেট অনুযায়ী বেতন-ভাতা দাবি করলে তাদের হুমকি দেওয়া হয় এবং চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখানো হয়।
শ্রমিক রবিউল ইসলাম ও আরিফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, অসুস্থতা বা জরুরি প্রয়োজনে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ছুটি নিলেও অনেক ক্ষেত্রে বেতন কেটে রাখা হয়। তারা বলেন, “কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বয়লার শ্রমিক বলেন, “আমি বেতন-ভাতাসহ মোট ৭ হাজার ৭০০ টাকা পাই। কয়েকবার আন্দোলন করেও বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি।”
কারখানার সুপারভাইজার জীবন হোসেন বলেন, “এক বছরের বেশি সময় ধরে এখানে কাজ করছি। বেতন-ভাতাসহ মোট ১০ হাজার ৩০০ টাকা পাই। কয়েক দফা আন্দোলনের পরও এখন পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি হয়নি।”
এ বিষয়ে কারখানার চীনা কর্তৃপক্ষের দোভাষী মো. মামুন বলেন, শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের চুক্তি রয়েছে। পূর্বে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। নতুন গেজেট প্রকাশের পর তা বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এজন্য কিছু সময় প্রয়োজন।
কারখানার জেনারেল ম্যানেজার মো. জমির হোসেন বলেন, “শ্রমিকদের কতটুকু মারধর করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে আমরা দেখেছি, চীনা ম্যানেজমেন্টের একজন কর্মকর্তাকে শ্রমিকরা মারধর করেছে। পরে সিসিটিভি ফুটেজ দেখতে গিয়ে দেখি হার্ডডিস্ক খুলে নিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে।”
বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, “গেজেট প্রকাশের পর উৎপাদন খরচের ওপর এর প্রভাব মূল্যায়ন করতে সময় লাগে। বিষয়টি শ্রমিকদের জানানো হয়েছে। চীনা মালিকপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দু-এক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিচালক মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, “গেজেট প্রকাশের পর কারখানা কর্তৃপক্ষ কিছু সময় চেয়েছিল। যেহেতু এটি বিদেশি বিনিয়োগে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান, তাই মালিকপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল। কবে থেকে গেজেট অনুযায়ী বেতন-ভাতা কার্যকর করা হবে, সে বিষয়ে জানতে ইতোমধ্যে শোকজ করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের ঘটনার পর মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। সেখানে আগামী মাস থেকে সরকারি গেজেট অনুযায়ী বেতন-ভাতা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি গত দুই মাসের বকেয়া পার্থক্যও ধাপে ধাপে পরিশোধ করতে কারখানা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



