রমজান মাসের প্রতিটি মুহূর্তকে যেন কাজে লাগানো যায়, ঈমানদারের মধ্যে সে প্রচেষ্টা থাকা উচিত। কেননা এ মাস আমলের মাস ইবাদতের মাস। এটি ইবাদতের বসন্তকাল। এখানে রমজানের বিশেষ কিছু আমল উল্লেখ করা হলো—

আমল

Advertisement

রোজা রাখা : ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি হলো রোজা।

আর রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে এ মাসে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে রোজা পালন করে।’
(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৫)

সাহরি খাওয়া : হাদিসে এসেছে, ‘সাহরি হলো বরকতময় খাবার। তাই কখনো সাহরি খাওয়া বাদ দিয়ো না।

এক ঢোক পানি পান করে হলেও সাহরি খেয়ে নাও। কেননা সাহরির খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তাআলা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন।’
(মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১১১০১)

ইফতার করা : সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা ফজিলতপূর্ণ আমল। এতে কোনো বিলম্ব না করা।

কেননা হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি রোজা পালন করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৩৫৭)
তারাবি ও তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করা : রমজানে কিয়ামুল লাইল করার কথা আছে। কিয়ামুল লাইল শব্দের অর্থ রাতের নামাজ। তারাবির নামাজ যেমন কিয়ামুল লাইলের মধ্যে পড়ে, তেমনি শেষ রাতে তাহাজ্জুদও সালাতুল লাইলের অন্তর্ভুক্ত।

সালাতুত তারাবি পড়া এ মাসের অন্যতম আমল। তারাবি পড়ার সময় তার হক আদায় করতে হবে। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াব হাসিলের আশায় রমজানে কিয়ামু রমাদান (সালাতুত তারাবি) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’
(বুখারি, হাদিস : ২০০৯)

সাহাবায়ে কেরাম জামাতের সঙ্গে তারাবি শেষ না করে বাড়ি ফিরতেন না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি তারাবি শেষ করা পর্যন্ত ইমামের সঙ্গে থাকল, সে সারা রাত ইবাদতের নেকি পেল।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৬)

দান-সদকার পরিমাণ বাড়ানো : প্রখ্যাত সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন, ‘মহানবী (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল। আর রমজানে তাঁর বদান্যতা আরো বেড়ে যেত।’(মুসলিম, হাদিস : ৩২০৮)

ইতিকাফ : ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।’

(মুসলিম, হাদিস : ১১৭১)

রোজাদারদের ইফতার করানো : রোজাদারকে ইফতার করালে রোজাদারের মতো রোজার সওয়াব পাওয়া যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজা পালনকারীকে (রোজাদারকে) ইফতার করাবে, সে রোজা পালনকারীর অনুরূপ সওয়াব লাভ করবে। এতে রোজা পালনকারীর সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।’

(মুসনাদ আহমদ, হাদিস : ২২৩০২)

তাওবা ও ইস্তিগফার করা : সর্বদা তাওবা করা ওয়াজিব, বিশেষ করে এ মাসে তাওবা করা উচিত। এ মাসে তাওবার অনুকূল অবস্থা বিরাজ করে। শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়, জাহান্নাম থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া হয়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রমজান মাস পেয়েও তার পাপ ক্ষমা করাতে পারেনি, তার নাক ধুলায় ধূসরিত হোক।’

(জামেউল উসুল, হাদিস : ১৪১০)

বেশি বেশি নেক আমল করা : রমজান মাসে অধিক হারে নেক আমল করতে চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য একান্ত আবশ্যক, বিশেষ করে রমজানের শেষ দশকে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘যখন রমজানের শেষ দশক এসে যেত, রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন রাত জাগরণ করতেন, পরিবারবর্গকে নিদ্রা থেকে জাগিয়ে দিতেন, লুঙ্গি শক্ত ও ভালো করে বেঁধে (প্রস্তুতি গ্রহণ) নিতেন।’ (মুসলিম, হাদিস : ১১৭৪)

বেশি বেশি জিকির করা : আল্লাহ তাআলার জিকির এমন এক মজবুত রজ্জু, যা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। তাঁর সান্নিধ্য লাভের পথ সুগম করে। মানুষকে উত্তম আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত করে। সরল ও সঠিক পথের ওপর অবিচল রাখে। এ কারণে আল্লাহ তাআলা মুসলিম ব্যক্তিকে দিবা-রাত্রি গোপনে-প্রকাশ্যে জিকির করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মুমিনরা! তোমরা আল্লাহকে বেশি পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল-বিকাল আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করো।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৪১-৪২)

একে অন্যকে কোরআন শোনানো : রমজান মাসে একজন অপরজনকে কোরআন শোনানো একটি উত্তম আমল। এটিকে দাওর বলা হয়। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, জিবরাইল (আ.) রমজানে প্রতি রাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং রাসুল (সা.) তাঁকে কোরআন শোনাতেন।

(বুখারি, হাদিস : ১৯০২)

কল্যাণকর কাজ বেশি বেশি করা : এ মাসে একটি ভালো কাজ অন্য মাসের চেয়ে অনেক বেশি উত্তম। সে জন্য যথাসম্ভব বেশি বেশি ভালো কাজ করতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘এ মাসের প্রতি রাতে একজন ঘোষণাকারী এই বলে আহবান করতে থাকে যে হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী, তুমি আরো অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের পথিক, তোমরা অন্যায় পথে চলা বন্ধ করো। (তুমি কি জানো?) এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তাআলা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৬৮৪)

লাইলাতুল কদর তালাশ করা : রমজান মাসে এমন একটি রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল-কোরআনের ঘোষণা, ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা : কদর, আয়াত : ৪)

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াব পাওয়ার আশায় ইবাদত করবে, তাকে আগের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি, হাদিস : ৩৫)

তাকওয়া অর্জন করা : তাকওয়া এমন একটি গুণ, যা বান্দাকে আল্লাহর ভয়ে সব পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে এবং তাঁর আদেশ মানতে বাধ্য করে। আর রমজান মাস তাকওয়া নামক গুণটি অর্জন করার এক বিশেষ মৌসুম। কোরআনে এসেছে, ‘হে ঈমানদাররা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে করে তোমরা এর মাধ্যমে তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো।’

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৩)

বিবাদ ও বেহায়াপনা থেকে বিরত থাকা : মাহে রমজানে মুমিনকে সব ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি, অশ্লীল কথা ও বেহায়াপনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে, বিশেষ করে অশ্লীল গানবাজনা এবং রেডিও, টিভি ও মোবাইলের অশ্লীলতা থেকে দূরে থাকতে হবে। তবেই সিয়ামের সওয়াব ও উচ্চ মর্যাদা লাভ করা যাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “যখন তোমাদের কেউ সিয়াম পালন করবে, তখন সে কোনো মন্দ কথা বলবে না এবং বাজে বকবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা লড়াই করতে আসে তখন সে যেন বলে, আমি ‘সায়েম—রোজাদার’।”

(বুখারি, হাদিস : ১৯০৪)

দোয়া করা : রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। তাই প্রত্যেক সায়েমের উচিত আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে বেশি বেশি দোয়া করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। (১) রোজাদার—যতক্ষণ না সে ইফতার করে, (২) ন্যায়নিষ্ঠ নেতা এবং (৩) মজলুমের দোয়া।’

(সহিহ ইবনু হিব্বান, হাদিস : ৩৪২৮)

মহান আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুন।

মাওলানা সাখাওয়াত উল্লাহ

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.