নিজের মুদি দোকান থাকা সত্ত্বেও মিরপুরের বাসিন্দা খলিলুর রহমান সন্তানের খাবার কিনতে ভরসা রাখেন নামী ডিপার্টমেন্ট স্টোরে। তার ধারণা, দাম কিছুটা বেশি হলেও ব্র্যান্ডেড খাদ্যপণ্য শিশুদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত। একই ভাবনা থেকে পরীবাগের বাসিন্দা সালেহা চৌধুরীও সন্তানদের জন্য একটু দামি ব্র্যান্ডের খাবারই বেছে নেন। এমন মনোভাব শুধু এই দুই অভিভাবকের নয়—বেশিরভাগ বাবা-মাই মনে করেন, পরিচিত ও নামী ব্র্যান্ড মানেই নিশ্চিন্ত খাবার।

ভালো ব্র্যান্ড

Advertisement

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বহুল পরিচিত ও ‘ভালো ব্র্যান্ড’ হিসেবেই পরিচিত অনেক শিশুখাদ্যেই ভয়ংকর মাত্রায় ভেজাল মিশছে। যেসব পণ্য চোখ বন্ধ করে শিশুদের জন্য কেনা হচ্ছে, সেগুলোর ভেতরেই থাকছে ক্ষতিকর উপাদান। এমনকি শিশুদের প্রিয় গুঁড়া দুধও তৈরি হচ্ছে ভেজাল ‘হোয়েই পাউডার’ দিয়ে, যেখানে প্রকৃত দুগ্ধ উপাদানের পরিমাণ নিতান্তই কম।

সম্প্রতি পরীক্ষাগারে যাচাই করা ‘গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার’-এ মাত্র ১৭ শতাংশ দুগ্ধ উপাদানের অস্তিত্ব মিলেছে। বিপরীতে অন্তত ৬৭ শতাংশই ভেজাল উপাদান। অর্থাৎ গুঁড়া দুধের নামে শিশুদের খাওয়ানো হচ্ছে মূলত ভেজাল সাদা পাউডার।

চকচকে মোড়কের আড়ালে ভেজাল

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কমদামি হোয়েই পাউডার ব্যবহার করে আকর্ষণীয় প্যাকেটে বাজারে ছাড়া হচ্ছে নানা ধরনের মিল্ক পাউডার। আদালতে ভেজাল প্রমাণিত হলেও আইনের ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে অল্প শাস্তিতেই পার পেয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। সাধারণ ক্রেতার পক্ষে বোঝার উপায় নেই—তিনি আসলে দুধ নাকি ভেজাল পাউডার কিনছেন।

শুধু দেশীয় নয়, আমদানি করা তথাকথিত ‘উন্নত মানের’ শিশুখাদ্যেও ভেজালের প্রমাণ মিলছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোর তদারকি দুর্বল হওয়ায় আইন থাকলেও তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। ফলে প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও বিক্রেতারা প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকেই যাচ্ছে।

গোয়ালিনী গুঁড়া দুধে ভয়াবহ অনিয়ম

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের খাদ্য পরিদর্শকরা কয়েক মাস আগে গোয়ালিনী ডেইলি ফুলক্রিম মিল্ক পাউডারের নমুনা সংগ্রহ করেন। রাসায়নিক ও ভৌত—উভয় পরীক্ষাতেই পণ্যটি মান উত্তীর্ণ হতে ব্যর্থ হয়।

পরীক্ষা প্রতিবেদনে দেখা যায়, এতে দুগ্ধ উপাদান রয়েছে মাত্র ১৭.০৮ শতাংশ। ভেজাল উপাদানের পরিমাণ ৬৭.৪৪ শতাংশ। দুগ্ধ চর্বি থাকার কথা ছিল প্রায় ৪২ শতাংশ, কিন্তু পাওয়া গেছে মাত্র ৭.৫৮ শতাংশ। একইভাবে প্রোটিন থাকার কথা ন্যূনতম ৩৪ শতাংশ হলেও মিলেছে মাত্র ৯.৫০ শতাংশ।

প্যাকেটের গায়ে পুষ্টিগুণের যে তালিকা দেওয়া ছিল, ল্যাব পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে তার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এমনকি সরকারি নির্ধারিত মান থেকেও উপাদানের বড় ধরনের বিচ্যুতি ধরা পড়ে।

এই ভেজাল প্রমাণিত হওয়ায় বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গোয়ালিনীর পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার এবং ৩ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেন। পাশাপাশি নিম্নমানের গুঁড়া দুধ সরবরাহের অভিযোগে এসএ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যান মো. সাহাবুদ্দিন আলমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়। পরে তিনি আদালতে হাজির হয়ে দোষ স্বীকার করেন এবং ভেজাল পণ্য তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। গত ডিসেম্বর মাসে গোয়ালিনীর কিছু প্যাকেট ধ্বংস করা হয়েছে।

শুধু গোয়ালিনী নয়

তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়ালিনীর পাশাপাশি আসলাম টি কোম্পানির ফুলক্রিম ও নন-ফ্যাট মিল্ক পাউডার, ডানো, ড্যানিশ, নেসলে ইনস্ট্যান্ট ফুলক্রিম মিল্ক পাউডার এবং স্টারশিপ গুঁড়া দুধও ল্যাব পরীক্ষায় মানোত্তীর্ণ হয়নি। এসব পণ্যের আমদানিকারকদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।

বিএসটিআই লোগো থাকলেই নিরাপদ নয়

বাজারে থাকা অনেক গুঁড়া দুধের প্যাকেটে বিএসটিআই লোগো ও কিউআর কোড দেখা গেছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রেই এসব লোগো নকল। বিএসটিআইয়ের সমন্বয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ তৌহিদুর রহমান জানান, কিউআর কোড স্ক্যান করে গ্রাহকরা পণ্যের নিবন্ধন যাচাই করতে পারেন। তবে নিবন্ধিত পণ্যেও ভেজাল প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

আমদানিকৃত চকলেটেও ঝুঁকি

শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় কিটক্যাট চকলেটেও মানহীনতার প্রমাণ মিলেছে। ঢাকার ফকিরাপুল থেকে সংগৃহীত কিটক্যাটের নমুনা পরীক্ষায় তা মানসম্মত নয় বলে সনদ দিয়েছে সরকারি ল্যাব। এ ঘটনায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। একইভাবে ‘কোকোলা ওয়েফার’ নামের একটি শিশুখাদ্যেও ভেজাল ধরা পড়েছে।

শিশুস্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব

বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদের উপপরিচালক ডা. মো. আকতার ইমাম বলেন, ভেজাল শিশুখাদ্য দীর্ঘমেয়াদে কিডনি ক্ষতি, শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বাধা এবং মস্তিষ্কের উন্নয়নে গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তিনি মনে করেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান জাকারিয়া জানান, বাজার থেকে নিয়মিত নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং ল্যাব সক্ষমতা বাড়াতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক পণ্যের বিষয়ে প্রশাসনকে জানাতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

সূত্র: দেশ রূপান্তর

Zoom Bangla News
Zoom Bangla News
inews.zoombangla.com
Follow

Follow Zoom Bangla News On Google

Open the Google follow page and tap the checkmark option to receive more updates from Zoom Bangla News in your Google news feed.

Follow Zoom Bangla News On Google

Mynul Islam Nadim is a journalist at Zoom Bangla News, contributing to news writing and editorial support. He is involved in refining content to ensure accuracy, clarity, and consistency for digital platforms. His work reflects a commitment to responsible journalism and audience-focused reporting.