হঠাৎ করেই দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তড়িঘড়ি করে টিকা কর্মসূচি হাতে নেয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকা দেওয়া হলেও হামে মৃত্যুর মিছিল কমছে না। গত ১৫ মার্চ থেকে আজ শুক্রবার (২২ মে) সকাল ৮টা পর্যন্ত হাম ও উপসর্গ নিয়ে ৪৯৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। কেন হামে মৃত্যু কমছে না এমন প্রশ্ন সবার মনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপুষ্টিতে ভুগছে এমন শিশুদের শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি না হওয়ায় হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর অন্যতম কারণ।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় গত এপ্রিলে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করে সরকার। ৫ এপ্রিল দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলায় এই কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ১২ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় টিকাদান কার্যক্রম বিস্তৃত করা হয়। ২০ এপ্রিল থেকে সারাদেশ ও বাকি সিটি করপোরেশনগুলোতে ক্যাম্পেইন চালানো হয় এবং পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ২০ মে এটি শেষ হয়। এই সময়ে এক কোটি ৮৩ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি অর্থাৎ, ১০৪ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা নেওয়ার পর বা প্রাকৃতিকভাবে সংক্রমণের পর শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত এক থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। সেই হিসেবে টিকা পাওয়া শিশুদের শরীরে এতদিনে সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক শিশুর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডি তৈরি ধীরগতিতে হচ্ছে বা যথাযথভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে তীব্র অপুষ্টি, ডায়রিয়া, প্রোটিনের ঘাটতি এবং দুর্বল পুষ্টি পরিস্থিতির কারণে অনেক শিশুর শরীরে প্রয়োজনীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠছে না। ফলে তারা সহজেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, এক মাসের বেশি সময় ধরে টিকাদান কার্যক্রম চললেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আশানুরূপভাবে কমছে না। তাদের মতে, এর একটি বড় কারণ হলো শিশুদের মধ্যে তীব্র অপুষ্টির হার। পর্যাপ্ত পুষ্টি, প্রোটিন ও ব্রেস্টফিডিংয়ের অভাবে অনেক শিশুর শরীরে টিকা কার্যকরভাবে কাজ করছে না বা প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে না। ফলে টিকার পাশাপাশি পুষ্টি নিশ্চিত করাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, “হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাসে। তবে, উন্নত বিশ্বে সাধারণত প্রথম ডোজ ১৫ মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ প্রি-স্কুলগামী চার থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের দেওয়া হয়। কারণ, সেখানে শিশুদের অপুষ্টির হার তুলনামূলকভাবে কম থাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি স্থিতিশীল থাকে।”
তিনি আরও বলেন, “হামের ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা শিশুর বয়স এবং পুষ্টির অবস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। বয়স যত কম হয়, টিকার কার্যকারিতা তত কম হয়। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকারিতাও বৃদ্ধি পায়। অপুষ্টি না থাকলে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হতে সাহায্য করে।”
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট টেনে এই চিকিৎসক বলেন, “মায়ের কাছ থেকে পাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সাধারণত নয় মাস পর্যন্ত শিশুকে হামের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। এই কারণেই নয় মাস বয়স থেকে টিকা দেওয়া হয়। কারণ এর পর থেকে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সুরক্ষা ধীরে ধীরে কমে যেতে থাকে। তবে, বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক শিশু নয় মাস বয়সের আগেই হামে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হচ্ছে।”
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দু’ভাবে পায়। প্রথমত, গর্ভে থাকাকালে গর্ভফুলের মাধ্যমে যে সুরক্ষা পায়, সেটিকে আইজিজি বলা হয়। দ্বিতীয়ত, জন্মের পর ব্রেস্টফিডিংয়ের মাধ্যমে যে সুরক্ষা পায়, সেটিকে আইজিএ অ্যান্টিবডি বলা হয়। এই দুই ধরনের সুরক্ষাই প্যাসিভ ইমিউনিটির অংশ, যা শিশুকে প্রাথমিকভাবে রোগ থেকে রক্ষা করে।
তিনি বলেন, “শিশুর শরীরে মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি অনেক সময় ভ্যাকসিনের কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। জন্মের পর শিশুর শরীরে আইজিজি এবং আইজিএ’র মাত্রা বেশি থাকে। তাই ৯ মাসের আগে টিকা দিলে তার কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে।”
এই বিশেষজ্ঞের মতে, ছয় মাস বয়সে টিকা দিলে ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ শিশুর ক্ষেত্রে ভ্যাকসিন কার্যকর হয়। ৯ মাস বয়সে এই কার্যকারিতা বেড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। আর ১৫ মাস বয়সে তা আরও বেড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়। প্রি-স্কুল বয়সে টিকা দিলে এর কার্যকারিতা আরও বেশি, প্রায় ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।
ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ভ্যাকসিন দেওয়ার পর শরীরে প্রথম যে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, সেটি হলো আইজিএমআই। এটি সাধারণত সাত দিনের মধ্যে তৈরি হয় এবং তাৎক্ষণিক সুরক্ষা দেয়। তবে, দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা দেয় না। দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেয় আইজিজি অ্যান্টিবডি, যা তৈরি হতে তিন থেকে চার সপ্তাহ সময় লাগে।
সব ধরনের অ্যান্টিবডিই মূলত প্রোটিন দিয়ে তৈরি জানিয়ে তিনি বলেন, “শিশু যদি অপুষ্টিতে ভোগে, শারীরিক বৃদ্ধি ঠিকমতো না হয়, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় থাকে, পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায় বা বুকের দুধ কম খায় তাহলে শরীরে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছে। হামের জটিলতা হিসেবে ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো সমস্যাও দেখা দিচ্ছে, যা শিশুমৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে।”
আরও পড়ুন : ২০২৬ সালে যে ৮ দক্ষতা আপনাকে সফলতা এনে দেবে
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরিচালক ডা. এফ এ আসমা খানম বলেন, “যে সকল মায়েরা টিকা নেননি, তাদের সন্তানরা সুরক্ষা পাচ্ছে না। এক্ষেত্রে গর্ভধারণের আগে নারীকে টিকা দিতে হবে। আমাদের এখানে কেউ চিকিৎসা নিতে এলে আমরা শুরুতেই জিজ্ঞাসা করি টিকা দেওয়া আছে কি না। টিকা থাকলে মায়েদের সন্তানরা গর্ভকাল থেকেই ম্যাটারনাল ইমিউনিটি নিয়ে জন্ম নেয়। এছাড়া ছয় ও ৯ মাস বয়সে শিশুদের হামের টিকা দিলে তারা আরও বেশি সুরক্ষিত থাকে। মায়েদের টিকা না থাকলে তাদের সন্তানরা হামে আক্রান্ত হতে থাকবে। যেসব শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা একেবারেই কম, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে।”
জুমবাংলা নিউজ সবার আগে পেতে Follow করুন জুমবাংলা গুগল নিউজ, জুমবাংলা টুইটার , জুমবাংলা ফেসবুক, জুমবাংলা টেলিগ্রাম এবং সাবস্ক্রাইব করুন জুমবাংলা ইউটিউব চ্যানেলে।



